ঝালমুড়ি বেচেই সংসারের পাশাপাশি চলে আলীর ৬ সন্তানের পড়াশোনার খরচও

আলফাজ সরকার আকাশ শ্রীপুর(গাজীপুর) থেকেঃ–কখনো মাথায় ঝুড়ি নিয়ে আবার কখনো দুই চাকার ঠেলা গাড়িতে ফেরি করে ঝালমুড়ি বিক্রি। চানাচুর ভাজা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, সরিষার তেল ও বুট দিয়ে অত্যন্ত মুখরোচকভাবে মুড়ি মাখিয়ে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করে যাচ্ছেন। জীবন-জীবিকার তাগিতে ফেরি করে ঝালমুড়ি বিক্রির টাকায় ৬ সন্তানের পড়াশোনার পাশাপাশি চালাচ্ছেন সংসারের খরচও।দারিদ্রের কষাঘাত থেকে কিছুটা মুক্তি পেলেও জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসেও ঝুড়ি কাঁধে নিয়ে ঝাল মুড়ি বিক্রি করতে হচ্ছে গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার মৃত আজগর আলীর ছেলে পঞ্চাশোর্ধ মোহাম্মদ আলীর।

শুক্রবার বিকেলে দক্ষিণ ভাংনাহাটি এলাকার একটি পোশাক কারখানার সামনে কথা হয় তার সাথে।

জানা যায়, মানুষের কাছ থেকে ধার নেয়া মাত্র ১৫’ শত টাকা পুঁজি নিয়ে ২০০০ সালে ঝালমুড়ি বিক্রি শুরু করেন তিনি। প্রথম দিকে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ঝাল মুড়ি বিক্রি করতেন শ্রীপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে। বিশেষ করে অফিস আদালতসহ শহরের বাজার গুলোতে পরিচিত ছিলেন তিনি ।

কেমন আছেন জানতে চাইলে ক্লান্ত কন্ঠে মোহাম্মদ আলী জানান, শরীরটা এখন আর আগের মতো কাজ করে না। তাই এক জায়গায় মুড়ি বিক্রি করি। এখন ব্যবসায় প্রতিদিন দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। এতে ৪শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা আয় হয়। এই উপার্জিত অর্থ দিয়েই সংসারের খরচের পাশাপাশি চালাচ্ছেন চার ছেলে ও দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ। বড় ছেলে ভাওয়াল বদরে আলম কলেজে ম্যানেজমেন্ট এ মাস্টার্স করছে । মেঝো ছেলে এবছর এইচ.এস.সি পাস করেছে। ছোট ছেলে শ্রীপুর কলেজিয়েট স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ে। সে পাশাপাশি আমার সাথে ব্যবসার কাজে সাহায্য করে। এক মেয়ে এসএসসি সমমানের দাখিল পাস করেছে। আর ছোট ছেলে-মেয়ে পড়ছে স্থানীয় একটি কওমী মাদ্রাসায় নাজরানা বিভাগে।

আবেগে কান্না জড়িত কন্ঠে তিনি আরোও বলেন, এই শহরে অনেকের আনন্দ দেখে নীরবে ফেলি চোখের পানি। বিশ্বাস করো, তোমাদের কারো আনন্দ দেখে, আমি কখনও হিংসা করিনা। কোন অসৎ কাজ নয় ব্যবসা ছোট হলেও সততার সাথে থাকলে ভাল ভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব হয়। এতে শহরের লোকজন আমাকে ভালবাসে এবং আমার মুখোরুচক ঝাল মুড়ি ইচ্ছা করে নেই বিশেষ করে ছাত্র/ছাত্রীসহ অনেকেই। ছেলে মেয়ে শিক্ষিত হয়ে ভালো চকরী করবে এবং দেশ ও জাতির ভাগ্য উন্নয়ন করবে সেসময় না হওয়া পর্যন্ত আমি জীবন যুদ্ধে এই ঝাল মুড়ি বিক্রি করেই যাবেন বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।

শ্রীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম জানান, মোহাম্মদ আলীর হাতে মাখা মুড়ির কোন তুলনাই করা যায়না। যে একবার খাবে তাকে পুনরায় আসতে হবে তার দোকানে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এ বয়সে এসেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে কর্ম শক্তিকে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয়, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গিকারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তিনি।

তিনি আরও বলেন, যদিও এ বয়সে একটু আরাম-আয়েশে জীবন কাটানোর কথা ছিল মোহাম্মদ আলীর। কিন্তু তার ঝাল মুড়ি বিক্রি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানোর সক্ষমতা অবশ্যই সমাজের অন্যদের অনুসরণ করা উচিৎ।