জোবায়ের আহমেদ” চাকরি ছেড়ে শুরু করেছিলেন মাশরুম চাষ।

এনামুল হাসান, স্টাফ রিপোর্টারঃ খাদ্য হিসেবে মাশরুম অতুলনীয়। প্রাচীনকাল থেকেই এটি পুষ্টিসমৃদ্ধ, সুস্বাদু ও দামী একটি খাবার হিসেবে পরিচিত। ধরিত্রীতে প্রায় ১৪ হাজার প্রজাতির মাশরুম রয়েছে। যার মধ্যে ৮ থেকে ১০টি জাতের বাণিজ্যিক চাষাবাদ হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আদ্রতা মাশরুম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ঢাকার কেরানীগঞ্জের মাশরুম চাষি “জোবায়ের আহমেদ” ২০০৭ সালে উচ্চশিক্ষা শেষ করে একটি বেসরকারি টেক্সটাইল কোম্পানিতে প্লান্ট ফরওয়ার্ডিং অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি নিউজিল্যান্ডের একজন ডাইং কনসালটেন্টের সমস্ত অর্ডারগুলো বাংলাতে ট্রান্সলেট করে দেয়ার কাজ করতেন। একদিন সেই ভদ্রলোকের কথায় তিনি ডাইংয়ের ফ্লোরে কাজ শুরু করেন। সেখানকার কর্মযজ্ঞ পরিবেশে প্রভাবিত হয়ে চিন্তা করেন নিজে এমন কোনো কর্মযজ্ঞ পরিবেশের সৃষ্টি করবেন। সেই ভাবনা থেকে ২০১১ সালে ২ ফিট বাই ৫ ফিটের একটি মাচার উপরে ৫০টির মতো স্পন নিয়ে শুরু করেন মাশরুম চাষ। বর্তমানে তার উৎপাদিত মাশরুম “ফ্যামিলি মাশরুম” নামে পরিচিত। মাশরুম চাষের আইডিয়াটা তিনি পেয়েছিলেন ২০০৫ সালে ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন ইন্দোনেশিয়ান এক বন্ধুর কাছ থেকে। শুরর দিকে গুলসানের মার্কেট গুলোতে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন তাদের দৈনিক মাশরুমের চাহিদা অনেক কম। কারণ তখন এর ক্রেতা ছিলো কেবল বিদেশীরা। এমন অবস্থায় মাশরুম উৎপাদন করে বিক্রি করাটা কঠিন বলে মনে হয়েছিলো তাঁর কাছে। তিনি তখন থেকেই দেশীয় ক্রেতা তৈরির চিন্তা মাথায় রেখে মাশরুম চাষ শুরু করেন।

তারপর থেকে কিভাবে উৎপাদন ও বিপনন শুরু করলেন সে সম্পর্কে তিনি বলেন, মাশরুম চাষ শুরুর আগে মনে রাখতে হবে ৪০ ভাগ সফলতা এর উৎপাদনে আর ৬০ ভাগ সফলতা বিপননে। তাই বলা যায় এর উৎপাদনের চাইতে বিপনন কঠিন। একারণে প্রথম থেকেই আমি উৎপাদনের চাইতে বিপনন নিয়েই কাজ করেছি বেশি। আমাদের দেশের অনেকেই মনে করেন শিক্ষিত মানুষ মাশরুম সম্পর্কে যানে তাই তাঁরা এটা খায়। এটা ভুল। কেননা মাশরুম আমাদের ফুড হ্যাবিটের সাথে যায় না। কারণ ছোট বেলা থেকে এটা খেয়ে আমারা অভ্যস্ত নই। তাই দেশীয় ক্রেতা তৈরির চিন্তা থেকে প্রথমে আমি কিছু স্ট্রিট ফুডের দোকান গুলোতে মাশরুম নিয়ে কাজ শুরু করি৷ পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্কুলের গেট ও পার্কে প্রাতভ্রমণে আসা স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মাঝে মাশরুম সম্পর্কে প্রচার প্রচারণা করতে থাকি। এতে করে ধীরে ধীরে মানুষ আমার মাশরুমের স্বাদ ও উপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারে। তাই আমার ক্রেতার সংখ্যা ও বিক্রি দুটোই বাড়তে থাকে। ক্রেতারা যাতে মাশরুমের পরিপূর্ণ স্বাদ পায় এজন্য প্রথমদিকে কেউ ১ কেজি মাশরুম কিনতে চাইলে আমি তাঁর কাছে ২’শ গ্রাম বিক্রি করতাম। এর কারণ একসাথে ১কেজি মাশরুম কেউ রান্না করে খায় না। অল্প কিছু রান্না করে বাকিটা ফ্রিজে রেখে দেয় যা পরে পঁচে যায়। আর এই পঁচে যাওয়ার একটা প্রভাব আমার মাশরুম বিক্রিতে অবশ্যই পড়তো। কেননা ফ্রিজে কোনো খাবার পঁচে গেলে সেই খাবার পরবর্তীতে বাসায় নেয়ার আগে মানুষ অনেকবার ভাবে। প্রথম দিকে বড় বড় রেস্টুরেন্টে মাশরুম কেবল নুডুলস ও স্যুপের সাথেই খাওয়া হতো। তবে এখন মানুষ অনেক ভাবেই মাশরুম খেতে পারে। এর জন্য আমি তৈরী করছি মাশরুমের আচার, কাবাব ও কোপ্তা। ইনশাআল্লাহ সামনে মাশরুমের চিপসও তৈরী করবো। এগুলো ছাড়াও আমরা তাজা মাশরুম, ড্রাই মাশরুম ও পাউডার মাশরুম বিক্রি করে থাকি। তিনি বলেন আমার দৈনিক ৪০ কেজির ওপরে মাশরুম উৎপাদন হতো তবে করোনাকালিন এর উৎপাদন অনেক কমিয়ে এনেছি কারণ লকডাউনে সব কিছু বন্ধ থাকায় এর চাহিদা কমে গেছে তাই এখন ১০কেজির মতো উৎপাদন করছি। আর আমার এখানে বর্তমানে ১২ জন শ্রমিক কাজ করছে যাদের ৮জন উৎপাদনে ৩জন মার্কেটিংয়ে ও ১জন অনলাইনে।

মাশরুম চাষে আগ্রহীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সরকারি ভাবে অনলাইনে ক্লাসের মাধ্যমে মাশরুম চাষ শেখানো হয়। তবে কেউ যদি হাতে কলমে শিখতে চায় আমার এখানে শেখার সেই সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে আমি তাদের উৎপাদন থেকে বিপনন পর্যন্ত হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এ পর্যন্ত যাঁরা আমার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মাশরুম চাষ শুরু করেছে আলহামদুলিল্লাহ তাঁরা প্রত্যেকেই ভালো অবস্থানে রয়েছে।

পরিশেষে তিনি বলেন, মাশরুম নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরী হওয়া দরকার। কেননা এর উপকারিতা অনেক। মাশরুমের উপকারিতা এতোটাই যে, কেউ যদি কোনো খাবার গ্রহণ না করে কেবল মাশরুম খেয়ে বেঁচে থাকতে চায় তবে তা সম্ভব। কারণ মাশরুমে সব রকম পুষ্টিগুন বিদ্যমান। মাশরুম সম্পর্কে মানুষ যতটা জানবে এর কদর ততটাই বাড়বে। এতে করে অনেকেই মাশরুম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠবে। দেশে মাশরুম চাষ বৃদ্ধি পেলে একদিকে যেমন বেকারত্বের হার কমবে অন্যদিকে তেমন পুষ্টির ঘাটতি দূর হবে। মাশরুমের পুষ্টিগুন সম্পর্কে জানতে গুগলের সহায়তা নেয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়াও “ফ্যামিলি মাশরুম” ফেইসবুক পেইজে অনেক তথ্য রয়েছে।

উল্লেখ্য, মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের তথ্যানুসারে, বর্তমানে প্রতি বছর দেশে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিক টন মাশরুম উৎপাদন হচ্ছে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৮’শ কোটি টাকা। প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ মাশরুম, মাশরুমজাত পণ্য উৎপাদন ও বিপণন সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ প্রায় সব দেশেই মাশরুম আমদানি করে থাকে। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাশরুম রপ্তানির অনেক বড় সুযোগ রয়েছে।