ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস

এইচ এম মেহেদী হাসান: বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রধান ও ঐতিহাসিক মাইলফলকের নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সারা বাংলার ছাত্র ও তারুণ্যের হৃদয়ের উত্তাপে জড়ানো অকুতোভয় এই সংগঠনের অভ্যুদয় নিশ্চিতভাবেই উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কাটাছেঁড়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে শ্যামলা-সুফলা এই পূর্ব বাংলা। ধর্মান্ধ পাকিস্তানের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের এই পূর্ণভূমিতে।ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি এবং আধিপত্যের আস্ফালন প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ব বাংলার নাম পাল্টে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান। মূলত পূর্ব বাংলার মাটির বর্ণাঢ্য গৌরবগাথা ক্ষত-বিক্ষত করতেই এমন অপচেষ্টা। অবশ্য জাতিসত্তায় সংশয়জাগানিয়া এমন কান্ড সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি বাংলার মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণসমাজ।দেশভাগের ছুতোয় দখলদার ইংরেজদের কুটিল মারপ্যাঁচে ভারতবর্ষ খন্ডিত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুই রাষ্ট্রে। যে স্বপ্ন নিয়ে এই পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানে যুক্ত হয়েছিল, সেই স্বপ্ন যে অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে তা মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই আঁচ করে নেয় ছাত্রসমাজ। প্রতিবাদের প্রথম আগুন ঝলসে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। মেধাবী ও প্রগতিশীল ছাত্রসমাজের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা এই প্লাটফর্ম থেকেই পরবর্তীকালে ভাষা,স্বাধীনতা ও পূর্বাপর আন্দোলন -সংগ্রামের প্রেক্ষাপট প্রণীত হয়েছে।
পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা -পরবর্তী ঘটনাপরিক্রমায় তার এ পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিরোধী শক্তির অনুপস্থিতিকে কাজে লাগান। শিক্ষার্থীদের সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েও ছাত্রলীগ শুরু থেকেই জাতীয় স্বার্থ ও জাতিগত মর্যাদা রক্ষায় একের পর এক লড়াই সংগঠিত করে তোলে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে নেতৃত্ব জুগিয়েছে সামনে থেকে, এর ফলে ছাত্রসমাজ শুধু নয়,সাধারণ মানুষও সমর্থন জুগিয়েছে ছাত্রলীগের প্রতি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষেত্র নির্মাণে তা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বলে রাখা ভালো ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৯৪৮ সালের পর ছাত্রলীগ গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছে। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সার্বজনীন এবং সর্ববৃহৎ গণআন্দোলন সংগঠিত হয়েছে ১৯৫২ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ও সাধারণ ছাত্রসমাজ মায়ের ভাষার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছাত্রলীগের সেই সংগ্রামের সাফল্যগাথা রচনা করেছে বাংলার মুক্তিকামী মানুষ,ছাত্রজনতা। কিন্তু এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চতুর্থ শেণীর কর্মচারীদের যৌক্তিক সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মূল্য বঙ্গবন্ধুকে শোধ করতে হয়েছে শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে।”>বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বাঙালি জাতির মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রধান ও ঐতিহাসিক মাইলফলকের নাম বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সারা বাংলার ছাত্র ও তারুণ্যের হৃদয়ের উত্তাপে জড়ানো অকুতোভয় এই সংগঠনের অভ্যুদয় নিশ্চিতভাবেই উপমহাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে অবিস্মরণীয় অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের কাটাছেঁড়ায় অস্তিত্ব সংকটে পড়ে শ্যামলা-সুফলা এই পূর্ব বাংলা। ধর্মান্ধ পাকিস্তানের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধের এই পূর্ণভূমিতে।ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি এবং আধিপত্যের আস্ফালন প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ব বাংলার নাম পাল্টে রাখা হয় পূর্ব পাকিস্তান। মূলত পূর্ব বাংলার মাটির বর্ণাঢ্য গৌরবগাথা ক্ষত-বিক্ষত করতেই এমন অপচেষ্টা। অবশ্য জাতিসত্তায় সংশয়জাগানিয়া এমন কান্ড সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি বাংলার মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণসমাজ।দেশভাগের ছুতোয় দখলদার ইংরেজদের কুটিল মারপ্যাঁচে ভারতবর্ষ খন্ডিত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুই রাষ্ট্রে। যে স্বপ্ন নিয়ে এই পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানে যুক্ত হয়েছিল, সেই স্বপ্ন যে অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে তা মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই আঁচ করে নেয় ছাত্রসমাজ। প্রতিবাদের প্রথম আগুন ঝলসে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। মেধাবী ও প্রগতিশীল ছাত্রসমাজের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা এই প্লাটফর্ম থেকেই পরবর্তীকালে ভাষা,স্বাধীনতা ও পূর্বাপর আন্দোলন -সংগ্রামের প্রেক্ষাপট প্রণীত হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের একটি সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা -পরবর্তী ঘটনাপরিক্রমায় তার এ পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পূর্ব পাকিস্তানে সরকারবিরোধী শক্তির অনুপস্থিতিকে কাজে লাগান। শিক্ষার্থীদের সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েও ছাত্রলীগ শুরু থেকেই জাতীয় স্বার্থ ও জাতিগত মর্যাদা রক্ষায় একের পর এক লড়াই সংগঠিত করে তোলে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে নেতৃত্ব জুগিয়েছে সামনে থেকে, এর ফলে ছাত্রসমাজ শুধু নয়,সাধারণ মানুষও সমর্থন জুগিয়েছে ছাত্রলীগের প্রতি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষেত্র নির্মাণে তা বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। বলে রাখা ভালো ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরের বছরই অর্থাৎ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ১৯৪৮ সালের পর ছাত্রলীগ গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রামে ঐতিহাসিক অবদান রেখেছে। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সার্বজনীন এবং সর্ববৃহৎ গণআন্দোলন সংগঠিত হয়েছে ১৯৫২ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ও সাধারণ ছাত্রসমাজ মায়ের ভাষার রক্ষার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যায়। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ছাত্রলীগের সেই সংগ্রামের সাফল্যগাথা রচনা করেছে বাংলার মুক্তিকামী মানুষ,ছাত্রজনতা। কিন্তু এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্ন বেতনভোগী কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। চতুর্থ শেণীর কর্মচারীদের যৌক্তিক সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার মূল্য বঙ্গবন্ধুকে শোধ করতে হয়েছে শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে।

১৯৬৯ সালে আগরতলা মামলায় পিতা শেখ মুজিব যখন কারান্তরীণ, তখন কন্যা শেখ হাসিনা রাজপথে প্রত্যক্ষ আন্দোলনের পাশাপাশি জেলগেটে পিতার সঙ্গে দেখা করে যাবতীয় দিকনির্দেশনা নিয়ে আসতেন ও ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বারবার বৈঠক করে আন্দোলনের কৌশল নির্ধারণ করতেন। আন্দোলন -সংগ্রামের সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য যে টাকা -পয়সা খরচ হতো বিশেষ করে ছাত্রলীগ নেতাদের খরচের বিষয়টি শেখ হাসিনা তাঁর মা বেগম মুজিবকে জানাতেন। বেগম মুজিব কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবের অনুপস্থিতি বুঝতেই দিতেন দিতেন না ছাত্রনেতাদের। তিনি নিজের সোনা গহনা বিক্রি করে,বাজারের খরচ বাঁচিয়ে আঁচলে বেঁধে রাখা ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে তুলে দিতেন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত আন্দোলন -সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলোতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ওপর জেল-জুলুমের মাত্রা যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে,তখন কেউই নিজের ঘরে ঘুমাতে পারতেন না। মাথায় গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে বহুদিনে আত্মগোপনকারী ছাত্রনেতাকর্মীরা ক্ষুধার্ত অবস্হায় ঘর্মাক্ত শরীরে ৩২ নম্বর বাড়িতে গভীর রাতে ঢুকলে বেগম মুজিব সর্বাগ্রে সাবান,গামছা, তেল এগিয়ে দিতেন গোসলের জন্য। তারপর নিজের হাতে রান্না করে মায়ের স্নেহে পাশে বসে খাওয়াতে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তাঁর এমন অপার্থিব মমতা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের পুরোদমে চাঙ্গা রাখত। ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের প্রথম কর্মসূচি ছিল ১৭ জানুয়ারি। ছাত্রলীগ ১৯৬৯ সালের ১৭ থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ দফা সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দেয়। ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি তোফায়েল আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক আ স ম আবদুর রব এক যৌথ বিবৃতিতে শত শহীদের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক ১১ দফা রচনার পটভূমি ও ১১ দফা বাস্তবায়নের জন্য ছাত্রলীগকে অবিরাম আপসহীন সংগ্রামের নির্দেশনা দেন। ছাত্রলীগের ঘোষণা অনুযায়ী সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট, চিত্র প্রদর্শনী,ছাত্রসভা, শোভাযাত্রা, শোক মিছিল, সাইকেল শোভাযাত্রা, কর্মিসভা,’দাবি দিবস’ পালন করা হয়। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বুঝতে পারে যে,পূর্ব পাকিস্তানে তাদের শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের পরিণতি খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে, তখন তারা নতুন করে প্রজন্মের মগজধোলাই করার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি ‘নামে একটি নতুন পাঠ্যবিষয় সংযুক্ত করে। স্কুল ছাত্রছাত্রীরা তখন এই বিষয় বাতিলের জন্য আন্দোলন শুরু করে সব ছাত্রসংগঠনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। ছাত্রলীগ স্বাধিকার তথা স্বাধীনতার জন্য বৃহৎ আন্দোলন নিয়ে থাকায় প্রথমে ছাত্রদের এই প্রস্তাবে মৌন সমর্থন দিলেও পরে ঢাকা নগর ছাত্রলীগের মাধ্যমে স্কুলছাত্রদের এই আন্দোলনকে সর্বদলীয় রুপ দিয়ে গভ.ল্যাবরেটরি স্কুলের মেধাবী ছাত্র মোস্তাক আহমেদ ও আজিমপুর গার্লস স্কুলের কৃতি ছাত্রী রোজীকে যথাক্রমে আহবায়ক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক করে ‘মাধ্যমিক স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ‘ গঠন করে দেওয়া হয়। পরে পুরান ঢাকার সর্বস্তরের স্কুলে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নবাবপুর হাইস্কুলের ছাত্র আবু বকরকেও যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। এ সময় ছাত্রলীগের নগর কর্মীরা ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,মেডিকেল কলেজ এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এ আন্দোলনের বিরাট অংশ ছাত্রলীগের ভাগে চলে আসে এবং এর ফলে স্কুলগুলোতে বিশেষ করে মেয়েদের স্কুল সংগঠন গড়ে তোলা হয়। আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করলে ছাত্রসমাজের চাপে পাকিস্তানি শাসকচক্র এই বই প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এই আন্দোলনের সফলতা ছাত্রলীগকে এনে দেয় এক বিরাট সাফল্য। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সীমিত পরিসরে ‘ঘরোয়া ‘রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেয় ইয়াহিয়া সামরিক সরকার। ৩০ মার্চ অপর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারের অধীনে ৭ ডিসেম্বর সমগ্র পাকিস্তানে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রাণশক্তি ছাত্রলীগ নির্বাচনী প্রচার ও গণসংযোগে নেমে পড়ে। এর আগের বছরের গণঅভ্যুত্থানের ফলে ছাত্রলীগ সাধারণ মানুষের আপনজনে পরিণত হয়েছিল। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছাত্রলীগ ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে স্বাধিকারের প্রশ্নে গণভোট হিসেবে গ্রহণ করে দেশের আনাচে কানাচে নির্বাচনী প্রচারে নেমে পড়ে। দেশের যেসব এলাকার আসনগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং সংবেদনশীল ছিল সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজে ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশনা দিয়ে পাঠাতেন। অনেক সময়ে স্হানীয় সমস্যার কারণে সরাসরি প্রার্থীর পক্ষে প্রচার করা সম্ভব ছিল না। সেসব ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এককভাবে নৌকার প্রার্থীর পক্ষে, স্বাধিকারের পক্ষে প্রচার চালাতেন। ৬ দফা এবং ১১ দফা মানুষের কাছে তুলে ধরতেন। ৪ জুন বঙ্গবন্ধু আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে দেশবাসীকে আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্বপাকিস্তানের ১৬২ টির মধ্যে ১৬০টি আসনে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী। ৭টি সংরক্ষিত মহিলা আসন মিলিয়ে আওয়ামী লীগের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৭টি। আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮৭টি আসনে জয় পায় পিপলস পার্টি। প্রাদেশিক নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে। এই ভূমিধস বিজয় সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া এবং ভুট্রোদের সব হিসাব ওলটপালট করে দেয়। তাদের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে জিতলেও পুরো পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি বানানোর টোপ দিয়ে ৬ দফা থেকে সরিয়ে আনা যাবে। কিন্তু নির্বাচনী ফলে তাদের বাসনা ভেস্তে গেল। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের সব নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের ৬ ও ১১ দফার প্রতি অবিচল থাকার শপথবাক্য পাঠ করান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এর পরদিন ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পল্টনের জনাকীর্ণ সমাবেশে ছাত্র-জনতাও শপথ নেয় এসব দাবি আদায়ের সংগ্রামে অটল থাকার। এই কঠোর শপথের ফুলকি থেকেই একাত্তর নামক আগ্নেয়গিরির উৎপত্তি। ১৯৭০ সালের ৭ জুন ‘৬ দফা’ দিবস উদযাপনকে একটি ঐতিহাসিক

“মাত্রা দেয়ার লক্ষ্যে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ হাতে নিতে শুরু করল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকনির্দেশনাকে অবলম্বন করে তারা নিজেদের মধ্যে কয়েক দফায় বৈঠকও করল। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ নেতাদের একটি স্বতন্ত্র পতাকা তৈরির নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নির্দেশনা মোতাবেক ছাত্রলীগের নেতারা পতাকা তৈরি করলো। ১৯৭০ সালের ৭ জুন সকাল ৯টায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে আ স ম আবদুর রব ও শেখ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে গগনবিদারী স্লোগানে রাজপথ কাঁপিয়ে এগিয়ে যায় পল্টন ময়দানের দিকে। সেখানেই বঙ্গবন্ধুকে সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানানো হয় ওই পতাকা দিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাগ্রহে সেটি গ্রহণ করে পাশে দাঁড়ানো বড় ছেলে শেখ কামালের কাছে গচ্ছিত রাখেন। সভা শেষে বঙ্গবন্ধু আ স ম আবদুর রবের হাতে পতাকাটি তুলে দেন। রব হাঁটু গেড়ে পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে তা গ্রহণ করেন। সেদিন ছাত্রনেতাদের হাতে বঙ্গবন্ধু পতাকা টি তুলে দিয়ে মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অত্যাসন্ন ও অনিবার্য সম্মুখ সময়ের প্রস্তুতি গ্রহণের চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা কর্মীরা দলে দলে অংশগ্রহণ করেছে। ১৭০০০ নেতা-কর্মীর শাহাদাৎ বরণের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করেছে বাংলা ও বাঙালির পরম প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৭২-৭৫ কালপর্বে দেশগড়ার সংগ্রাম, ১৯৭৫-৯০ সময়ে সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রাম, ১৯৮৩ সালে শিক্ষা আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের দশ দফা রচনায় ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৯১-৯৬ সময়ে তত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯৯৬-২০০১ সালে দেশগঠন মূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার অধিকার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে শামসুল হক ও পরবর্তীতে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী কমিশনের সহায়তায় এগিয়ে আসে এবং শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট তৈরিতে সহায়তা করে। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বেতন বৃদ্ধির প্রতিবাদী আন্দোলনে ছাত্রলীগ সমর্থন দেয়। এই সময়ে বন্যা পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা অসামান্য অবদান রাখে। বিএনপি জামাতের ৯২ দিনের জালাও পোড়াও আগুন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে প্রতিবাদ করেছে ছাত্রলীগ। কিন্তু আজ ছাত্রলীগকে অনেক নেতিবাচক সংবাদের শিরোনামে দেখা যায়। তবেও কি কিছুটাও হলেও ছাত্রলীগের সুনামে ভাটা পড়ছে? তবে মনে হয় না, কিছু কৌশলগত কারণে ছাত্রলীগ হেরে যাচ্ছে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বিএনপি জামাতের অপপ্রচার ও তাদের দোসরেরা ছাত্রলীগের ভিতরে অনুপ্রবেশ করে ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা বৈকি আর কি? সারা বিশ্বের সফল রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা’র নেতৃত্বে যখন পিতা মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ উন্নয়ন ও শান্তির রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বের বিস্ময় সৃষ্টি হয়েছে। স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে ছাত্রলীগ যেহেতু শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে, তাই শেখ হাসিনাকে বিব্রত করতেই ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি। তবে সব অপশক্তির জাল ছিন্ন করে ছাত্রলীগ তার আপন মহিমায় সগৌরবে এগিয়ে যাবে। তাই আজ ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে,১৯৪৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বাঙালি জাতির শান্তিতে সংগ্রামে দুর্যোগে দূর্বিপাকে ছাত্রলীগ পাশে ছিল, আজো তাই-ই আছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাই যথার্থই বলেছেন, ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস। ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস।”

লেখক; কলামিস্ট, সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।