চট্টগ্রাম নতুন কালুরঘাট সেতু আগামী ৩ বছরের মধ্যে

চট্টগ্রাম নতুন কালুরঘাট সেতু নকশা

জাহাঙ্গীর আলম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ চট্টগ্রাম কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাট রেলসেতুটি নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয় ১৯১৪ সালে। সে সময় ব্রিটিশরা বার্মায় সৈন্য আনা-নেওয়ার কাজে এটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৩০ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৭১-এ সেতুটির উত্তর ও পশ্চিম পাশে ঘাঁটি করে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল মুক্তিবাহিনী। ৯০ বছর বয়সী মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুটির এখন মরণদশা। তবু ঝুঁকি ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে দিনে প্রায় ১ লাখ এর অধিক লোক এই সেতু ব্যবহার করে যাচ্ছে।

একমুখী কালুরঘাট সেতুর স্থানে নতুন করে একটি দ্বিমুখী সড়ক ও রেলসেতু নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়রা। সর্বশেষ গত বছর জুলাই মাসে অনশন করেন বোয়ালখালীর মুক্তিযোদ্ধারা। ডিসেম্বরের ২০১৯ মধ্যে নতুন সেতুর বিষয়ে সুরাহা না হলে সংসদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণাও দেন স্থানীয় সাংসদ মরহুম মইন উদ্দীন খান বাদল। দীর্ঘদিন ধরে নতুন কালুরঘাট সেতুর জন্য আন্দোলন করছেন স্থানীয়রা। কিন্তু দাবি পূরণ হয়নি। শুধু ১০ বছর ধরে আশার বাণী শুনেছেন তারা।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পূর্ব পটিয়া, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া, শহরের চান্দগাঁও ও মোহরা এলাকার প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর নির্ভরশীল। কালুরঘাট সেতুর পশ্চিম পাশ (শহর এলাকা) থেকে বোয়ালখালী সদর গোমদন্ডির দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। কিন্তু ১০ মিনিটের এই পথ যেতে এখন সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। সেতুতে ওঠার জন্য সব সময় দুদিকে গাড়ির দীর্ঘ সারি থাকে।

মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় রেলওয়ে সেতুটিকে ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এরপর ২০১১ সালে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একদল গবেষকও এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা দেয়। সেতুর পূর্বপাশে দুটি সাইনবোর্ড দিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। একটিতে লেখা ‘১০ টনের অধিক মালামাল পরিবহন নিষেধ।’ অপরটিতে লেখা, ‘এই সেতুর ওপর দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচল নিষেধ। আদেশ অমান্যকারীকে ফৌজদারিতে সোপর্দ করা হবে।’

এসব বিধিনিষেধ কিছুই মানা হচ্ছে না। ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন পারাপার করে তেমনি অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই ট্রাকও চলছে। সেতুর মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে গেলে অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয়।

তবে এবার বহু আকাঙ্ক্ষিত সেতুটি বাস্তবে রূপ পাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণ করে দেবে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সেতুর ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকা। এরমধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকা দক্ষিণ কোরিয়া ও বাকি ৫০০ কোটি সরকার অর্থায়ন করছে। সেতু নির্মাণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তিন বছর।

চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের অগ্রগতি পরিদর্শন শেষে ১২ সেপ্টেম্বর নগরের সার্কিট হাউজে রেলপথ মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন নতুন কালুরঘাট সেতুর নকশা তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছেন। এছাড়া এ সেতুর অর্থায়নে দক্ষিণ কোরিয়াও সম্মতি দিয়েছে বলে জানান তিনি।

মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, যেহেতু অর্থায়ন মিলছে তাই এবার নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণ হবেই। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখছেন।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কালুরঘাট সেতু নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাবনা ও মতামত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) কাছে পাঠিয়েছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়া কিছু টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর মতামত জানতে চেয়েছে।

ইডিসিএফের সিনিয়র লোন অফিসার ইয়েলি কিম স্বাক্ষরিত চিঠিতে রেলওয়ে কাম রোড ব্রিজ অথবা শুধু রেল সেতু নির্মাণের বিষয়ে রেলওয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া হয়। পাশাপাশি সর্বনিম্ন স্ট্যান্ডার্ড নেভিগেশনাল ছাড়পত্র কত হবে, সিঙ্গেল নাকি ডাবল রেললাইন, লেন সংখ্যা, সেতুর টাইপ (এক্সট্রা ডোজড/ট্রাশ), রেলওয়ে গেজ (সিঙ্গেল/ডাবল), ব্রড গেজ বা মিটার গেজ এবং প্রকল্পের সম্ভাব্য আর্থিক ব্যয় সম্পর্কে কূটনৈতিক চ্যানেলে বিস্তারিত প্রস্তাব পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সেগুলো নিয়ে কাজ করছে।

এছাড়া নতুন কালুরঘাট সেতুর টেকনিক্যাল বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেতুটির উচ্চতা নিয়ে আপত্তি। রেলওয়ের প্রস্তাবিত নকশায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেতুর উচ্চতা ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ মিটার। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সেতুর উচ্চতা ১২ মিটার করার শর্ত দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

ইতোমধ্যে উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়ে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে রেলওয়ে। কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদন জমা দিলে বিআইডব্লিউটিএ’র সঙ্গে বসে বিষয়টি মীমাংসা করা হবে। তাদের শর্ত পূরণ করে নকশা তৈরির কাজও করছে রেলওয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, আমরা সেতুটি দুই লাইন করতে চাচ্ছিলাম। দুইটি রেল, দুইটি রোড। কিন্তু এভাবে করলে সেতুটি অনেক বড় হয়ে যাবে বলে জানিয়েছে দ্য ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড।

‘তারা সেতুতে একটা রেল আর দুইটি রোড করতে বলেছে। তাহলে সেতুটি একটু ছোট হবে। খরচও কম হবে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা চিন্তা-ভাবনা করছি। তাদের পরামর্শ ও আমাদের মতামতগুলো পাঠালেই তারা সেতু নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করে দেবে ।