চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ২০০৮ সালে বাতিল মূল ডকুমেন্টস লুকিয়ে জালিয়াতি ও রহস্যজনক কারনে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নবায়ন

চিটাগাং কাস্টমস্ সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের বন্দর বিষয়ক সম্পাদক মোঃ লিয়াকত আলী হাওলাদারের প্রতিষ্ঠান ‘ মেসার্স এল এইচ ইন্টারন্যাশানাল’

জাহাঙ্গীর আলম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ নিজস্ব পণ্য অথবা কমিশনের বিনিময়ে আমদানিকারকের পক্ষে শুল্ক স্টেশনে পণ্য খালাসে সহায়তা করে সিএন্ডএফ এজেন্ট। এছাড়া মূল লাইসেন্সে উল্লিখিত কাস্টমস স্টেশন ছাড়াও অন্য কাস্টমস স্টেশনে রেফারেন্স লাইসেন্সর মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে মূল লাইসেন্সের কপি ও প্রয়োজনিয় দলিলাদিসহ আবেদন করতে হয়। আর লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ দলিলাদি যাচাই-বাছাই করে আবেদন গ্রহণ করলে, তবেই কাজ করার সুযোগ থাকে। তবে কোন কারণে মূল্য লাইসেন্স বাতিল হলে রেপারেন্স লেইসেন্স নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। ২০০৮ সালে ভোমরা শুল্ক স্টেশনে মূল লাইসেন্স বাতিল হলেও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সেই লাইসেন্স বিপরীতে রেফারেন্স লাইসেন্স নবায়ন করেছে ২০২৩ পর্যন্ত। চিটাগাং কাস্টমস্ সিএন্ডএফ এজেন্ট
এসোসিয়েশনের বন্দর বিষয়ক সম্পাদক মোঃ লিয়াকত আলী হাওলাদারের প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স এল এইচ ইন্টারন্যাশানাল’ এর মূল লাইসেন্স ২০০৮ সালে ভোমরা শুল্ক স্টেশন বাতিল করে। কিন্তু মেসার্স এল এইচ ইন্টারন্যাশানাল রেপারেন্স লাইসেন্স চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নবায়ন করা হয়েছে।

যদিও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপন ‘এস,আর,ও নং- ১৭৪-আইন/২০১৬/৩৬/কাস্টমস’ অনুসারে জানা যায়, রেফারেন্স লাইসেন্স নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কাস্টমস এজেন্ট মূল লাইসেন্সে উল্লিখিত কাস্টমস স্টেশন ব্যতীত অন্য কোন কাস্টমস স্টেশনের রেফারেন্স লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য মূল লাইসেন্সের কপি এবং বিধি ৫ এ বর্ণিত দলিলাদিসহ আবেদন করতে হবে এবং লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ উক্ত দলিলাদি যাচাই-বাছাইপূর্বক আবেদনকারীর মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে রেফারেন্স লাইসেন্স প্রদান করবে। একই সাথে কাস্টমস এজেন্ট এর ন্যূনতম দশ বৎসরের সন্তোষজনক কার্যক্রম পরিচালনা করিবার অভিজ্ঞতা কথাও বলা হয়েছে। যদিও রেফারেন্স লাইসেন্সের ক্ষেত্রে কাস্টম হাউস মূল কাস্টম হাউসে চিঠি পাঠিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের সব বিষয়ের তথ্যসহ পাঁচ বছরের সন্তোষজনক কার্যক্রম মূল্যয়ন করে।

কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস লিয়াকত আলী হওলাদারের প্রতিষ্ঠান মেসার্স এল এইচ ইন্টারন্যাশানালের রেফারেন্স লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে কোনটিই করেনি। জানা যায়, লিয়াকত আলী হওলাদার বাতিলকৃত মূল লাইসেন্স কাস্টমসের লাইসেন্স শাখায় দাখিল না করে ২০০৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। যা ২০১৮ সালে নবায়ন করা হয় ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

তবে এই জালিয়াতি ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দৃষ্টিগোচর হলে, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট রেফারেন্স লাইসেন্সটি বাতিল করতে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসকে নির্দেশ দেয় এনবিআর। এনবিআর থেকে পাঠানো ০৮.০১.০০০০.০৫.০০৩.১৬/১৮০ নং নথিতে বলা হয়, কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০১৬ এর বিধি ৯(১)(ক) তে লাইসেন্স নবায়নের ক্ষেত্রে ‘মূল লাইসেন্সের কপি’ দাখিলের বিধান রয়েছে। কিন্তু সিএন্ডএফ এজেন্ট মেসার্স এল এইচ ইন্টারন্যাশানালের মূল লাইসেন্স ২০০৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাতিল হলেও চট্টগ্রাম কাষ্টম হাউস ১৪ নভেম্বর ২০১৮ সাল থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৩ সাল পর্যন্ত নবায়ন করা হয়। যা বিধি সম্মত হয়নি মর্মে প্রতীয়মান।

এক্ষেত্রে বিধি লঙ্গনের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এবিষয়ে জানতে মেসার্স এলএইচ ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধীকারী মো: লিয়াকত আলী হাওলাদারের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমার মূল্য লাইসেন্স কোন দুর্নীতি বা শুল্ক ফাঁকির জন্য বাতিল হয়নি। আমার এই লাইসেন্স ১৯৮৬ সালের করা। ওখানে কোন কাজ না কারায়, আমি নিজেই স্যারেন্ডার করেছি। ওই সময় রেফালেন্স লাইসেন্স বলে কিছু ছিলো না। ২০০৯ সালে রেফারেন্স লাইসেন্স আসে। কিন্তু বর্তমানে
এনবিআর থেকে একটা চিঠি এসেছে। তাই বিষয়টা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শেষ করতে চাই। আমি আপিল কররার ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

এবিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, ‘এবিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। আপনি লাইসেন্স কমিটির সাথে কথা বললে তারা আপনাকে বিষয়টা বিস্তারিত জানাতে পারবে। তবে আইন
অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে কি ভাবে আইন লঙ্গন করে লাইসেন্স নবায়ন করেছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস এবং মেসার্স এল এইচ ইন্টারন্যাশানালের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে ? এমন প্রশ্নের উত্তর পেতে লাইসেন্স কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার ড. আবু নূর রাশেদ আহম্মেদের সাথে ওনার অফিসে গিয়ে দখা করা যায়নি। একই সাথে দুই দিন একাধিক বার ফোন করলেও রাশেদ আহম্মেদ ফোন রিসিভ না করায় কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে সাধারণ সিএন্ডএফ এজেন্টস সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের কিছু কিছু নেতৃবৃন্দদের অপকর্মের দায়ভার সাধারণ সদস্যদের নিতে হচ্ছে যা পক্ষান্তরে সিএন্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ভাবমূর্তির বিনষ্ট হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু ইসি কমিটির সদস্যদের লাইসেন্স বিভিন্ন অপকর্মের জন্য সাসপেন্ড হয়েছিল যা পরবর্তীতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কে ম্যানেজ করে পুনরায় চালু করা হয়েছে।এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।