চট্টগ্রাম কাস্টমস ১২৩ শিপিং এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল

জাহাঙ্গীর আলমঃ

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

আমদানি পণ্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ ও রপ্তানি পণ্য বিদেশে পাঠানোর যাবতীয় কাজই শিপিং এজেন্সিগুলো সম্পন্ন করে। আর এ কাজের জন্য ওই প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট কাস্টম হাউস থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য লাইসেন্স নিতে হয়, যা আবার মেয়াদান্তে নবায়ন করতে হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে নিবন্ধিত অনেক শিপিং এজেন্টের লাইসেন্সের মেয়াদ কয়েক বছর আগে শেষ হলেও আজ পর্যন্ত তারা নবায়ন করেনি। পরিশোধ করেনি কোনো ফি। তাই দুই বছরের বেশি সময় পার হওয়া ও বিভিন্ন অপরাধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকায় ১২৩টি শিপিং এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস। বাতিল হওয়া লাইসেন্সে আসা কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আর খালাস নিতে পারবে না

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের ডেপুটি কমিশনার সুলতান মাহমুদ আমার সময়কে জানান, জুন মাসের শুরুতে আমাদের তালিকায় মোট ১৩২টি শিপিং কোম্পানির নাম ছিল। তবে যাচাই-বাছাইয়ে আমরা ১২৩টি কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেছি। অনেক প্রভাবশালী কোম্পানির লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে। ব্যবসা পরিচালনায় নিয়মনীতি সঠিকভাবে মানেননি এসব কোম্পানি মালিকেরা। এছাড়া কিছু কোম্পানি লাইসেন্স নবায়ন করতে না পারায় এগুলো বাতিল করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম আমার সময়কে বলেন, এদের বেশিরভাগই লাইসেন্স নবায়ন করেনি। এ ক্ষেত্রে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। আমরা তাদের একাধিকবার তাগাদা দিয়েছি। কিন্তু তারা সাড়া না দেয়ায় আমরা নিয়ম অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিল করেছি। সরকারকে রাজস্ব না দিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে কাউকে ব্যবসা পরিচালনা করতে দেব না।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মো. আরিফ বলেন, নতুন শিপিং লাইসেন্স না দিয়ে উল্টো বাতিল করা হচ্ছে, এটা ভালো লক্ষণ নয়। নতুন লাইসেন্স দিলে কিছু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হত। বাতিল হওয়া লাইসেন্সের মাধ্যমে আসা কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস করা যাবে না। এতে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হবে। আমরা কয়েকদিন আগে কাস্টমস কমিশনারে সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি, যাতে নতুন শিপিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে ইস্যুকৃত শিপিং এজেন্টস লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২৩টি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়নের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়া পরও তা নবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। তাই কাস্টমস এজেন্ট লাইসেন্সিং বিধিমালা, ২০২০-এর বিধি-১৫ অনুযায়ী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছে বিধায় একই বিধির বিধি-২৩ অনুযায়ী তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তাই এ প্রতিষ্ঠানগুলোর এআইএন লক করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে কাস্টমস কর্র্তৃপক্ষ।

শিপিং এজেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে মেকো শিপিং, এসএস শিপিং অ্যান্ড চার্টারিং লিমিটেড, এটলাস লজিস্টিকস বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড, মেরিন শিপিং সার্ভিসেস, এমএসসি বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড, এলাইড এক্সপ্রেস শিপিং লিমিটেড, ইডি ট্যাংকারস লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড ট্রেড শিপিং লাইন্স, নোবেল শিপিং লাইন এবং এইচ কে শিপিং লাইন্স।

এ তালিকায় আরও রয়েছে সী-লাক শিপ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, জেসিকা শিপিং লাইন্স, এসএসআর শিপিং এজেন্সীজ, সী সাইন মেরিটাইম লিমিটেড, ইলেন্ড শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকস, মিলেনিয়াম শিপিং লাইন্স, সাদেক মাল্টিট্রেড, জারা শিপিং লাইন্স, জিল মেরিন সার্ভিস, সুপরা শিপিং সার্ভিসেস লিমিটেড, ওশানাস শিপিং এজেন্সি, ওশ্যান শিপিং লাইন্স লিমিটেড, পারফেক্ট শিপিং লাইন্স, স্যাম শিপিং এজেন্সি, ইন্ট্রা পোর্ট মেরিন লিমিটেড এবং তেজারত শিপিং লাইন্স।

আরও রয়েছে এসএস শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেড, গোল্ড ভিউ শিপিং লিমিটেড, সি ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড, এইচই শিপিং এজেন্সি লিমিটেড, ম্যাক্সিকন শিপিং এজেন্সিজ (বাংলাদেশ) প্রাইভেট লিমিটেড, ল্যামস ক্লির্ফোড অ্যান্ড কোং লিমিটেড, কেএমজেড এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, বাংলাদেশ কন্টেইনার লাইন্স লিমিটেড, জোবায়ের শিপিং এজেন্সি, সার্ব শিপিং এজেন্সি লিমিটেড, সামুনদা শিপস সার্ভিস লিমিটেড, কিউসি নেভিগেশন লিমিটেড, এএসএল শিপিং লাইন্স লিমিটেড।

তালিকায় রয়েছে ওশ্যান কিং কন্টেইনার লাইন্স, আর ওয়াই শিপিং লাইন্স লিমিটেড, হ্যানজিং শিপিং বাংলাদেশ লিমিটেড, ওয়ার্ল্ড ট্রাস্টেড শিপিং করপোরেশন, ইন্টারলিংক লজিষ্টিকস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন, ওশ্যান স্টার শিপিং লাইন্স, মেরিন শিপ ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, পোর্ট সিটি শিপিং লজিস্টিকস, ফ্রেইট মাস্টারস প্রাইভেট লিমিটেড, এইচএসএ শিপিং অ্যান্ড লজিস্টিকস, সিঙ্গাপুর ইস্টার্ন এজেন্সি, ইন্টারমেরিন প্রাইভেট লিমিটেড, বেন আম এজেন্সি লিমিটেড, সামপান মেরিটাইম লিমিটেড, এওয়ার্ডস ট্রান্সপোর্টেশন লিমিটেড, প্রাইমেক্স লজিস্টিকস ইন্টারন্যাশনাল।

এমএইচ গ্লোবাল লজিস্টিকস লিমিটেড, ডিএনএস ইন্টারন্যাশনাল, দি ওরিয়েন্ট কনটেইনার লাইন্স লিমিটেড, বীকন শিপিং লাইন্স লিমিটেড, ম্যাজেস্টিক শিপিং লিমিটেড, মারওয়া শিপিং এজেন্সি লিমিটেড, ফ্রাংক শিপিং লিমিটেড, ইউনি বেঙ্গল কনটেইনার ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, কমিটমেন্ট শিপিং লাইন্স, পূর্বাচল শিপিং লাইন্স, ম্যাক-নেলস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও মেরিটাইম সার্ভিসেস লিমিটেড রয়েছে এ তালিকায়।

লাইসেন্স বাতিল হয়েছে ট্রান্স ওশ্যান লাইন্স লিমিটেড, ওশ্যান মেরিন শিপিং লিমিটেড, ইস্টার্ন লজিস্টিকস লিমিটেড, রয়েল মেরিন মেনেজমেন্ট, ইউনাইটেড কনটেইনার সার্ভিসেস লিমিটেড, এরিয়েল ট্রেড অ্যান্ড শিপিং লিমিটেড, কিং ওশ্যান শিপিং লাইন্স, সার মেরিটাইম এজেন্সিস লিমিটেড, টোটাল ফ্রেইট লিমিটেড, সাস ওশান লাইন্স মার্ট কার্গো লিমিটেড, মাস্টার ওশান ভয়েজ এন্টারপ্রাপইজ, শিপিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ইলেভেন ঈগল লজিস্টিকস লিমিটেড, ইউনিভার্সেল কন্টেইনার লাইন্স লিমিটেড, হার্ডসন অ্যান্ড হিগিংন্স লিমিটেড, আর কে শিপিং এজেন্সি।

আরও বাতিল হয়েছে ইস্টার্ন মেরিটাইম লিমিটেড, বানশিপকো (এফএফ) লিমিটেড, সিএমএ-সিজিএম বাংলাদেশ শিপিং লিমিটেড, গ্লোব লিংক কনটেইনার লাইন্স লিমিটেড, ট্রান্স ওয়ার্ল্ড ইস্ট এশিয়া লিমিটেড,ডব্লিউ আর শিপিং বাংলাদেশ লিমিটেড, প্রগতি শিপিং বাংলাদেশ লিমিটেড, নিউ ফানেল ট্রেডার্স, মেরিন ভ্যাসেল সার্ভিসেস প্রা. লিমিটেড, সিনডী শিপিং লাইন্স, সী সান শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং এজেন্সি, এআরও শিপিং এন্ড লজিষ্টিকস লিমিটেড ও ওশান মেরিটাইম এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেডে।

লাইসেন্স বাতিল হওয়ার তালিকায় থাকা অন্য এজেন্সিগুলো হচ্ছে সাউথ ইস্ট ট্রেডিং লিমিটেড, কামনা শিপিং এজেন্সি, স্পেনস ম্যাক বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড, বেনডাচ ফ্রেইট সার্ভিসেস লিমিটেড, ব্যাংকো শিপিং লিমিটেড, লাসিকো লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল শিপিং লাইন্স, ট্রান্সকন্টিনেন্টাল শিপিং লাইন্স লিমিটেড, স্কেন শিপিং প্রা. লিমিটেড, জে কে শিপিং লাইন্স, ভাইকিং এসোসিয়েটস লিমিটেড, পাইওনিয়ার শিপিং এজেন্সিজ লিমিটেড, মালটিমুড ট্রান্সপোর্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড, ট্রান্স মেরিটাইম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ডায়নামিক শিপিং লাইন্স লিমিটেড, ইউনাইটেড সী লাইন্স লিমিটেড, সানমুন শিপিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, ইউনাইটেড মেরীন ট্রান্সপোর্ট লিমিটেড, সমুদ্রাযাত্রা শিপিং লাইন্স লিমিটেড, এপেক্স শিপিং লাইন্স লিমিটেড, নাফিকো শিপিং লিমিটেড, সেন্ট্রান্স মেরিটাইম বিডি লিমিটেড, রতনপুর শিপিং সার্ভিসেস লিমিটেড, আমান শিপিং এজেন্সি ও এম এইচ শিপিং লাইন্স।

জানা গেছে, মালিকানার ধরন অনুযায়ী তিন ধরনের শিপিং কোম্পানি রয়েছে দেশে। সরাসরি বিদেশি মালিকানাধীন, দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন ও জাহাজ পরিচালনাকারী বিদেশি সংস্থাগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধি। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সমিতির সদস্যভুক্ত প্রায় ৪৫০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান জাহাজ বন্দরে আসার পর জাহাজের যাবতীয় কাজের তদারকি করে। প্রতিটি জাহাজের ক্ষেত্রে বন্দর, কাস্টমস, নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরসহ অনেক সংস্থার সঙ্গে নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। আবার জাহাজ বা কনটেইনার পরিবহন পরিচালনাকারী বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়।

উল্লেখ্য, চলতি বছর মার্চে ১২২ সিএন্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল করেছিল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। নির্দিষ্ট সময়ে নবায়ন না করা ও মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির সঙ্গে জড়িত থাকাসহ নানা অপরাধে লাইসেন্স বাতিল করা হয় তখন।