চট্টগ্রামে ”ম্যানেজে” চলতেছে পাহাড় নিধন

পাহাড়ের বোবা কান্না

পাহাড়ের বোবা কান্না,চট্টগ্রামে ”ম্যানেজে” চলতেছে পাহাড় নিধন

জাহাঙ্গীর আলমঃ ‘পাহাড়ের কান্নাকে ঝর্ণা সবাই বলে, সেই ঝর্ণা ধারায় পাহাড় কষ্টের নদী বয়ে চলে…।’ পাহাড় নিয়ে এমন কথামালাকে ভরাট কণ্ঠে অন্য মাত্রা দেন ব্যান্ডশিল্পী জেমস। শূন্য দশকের সেই গান এখনো কানে বাজে। বাস্তবতাও তাই, ক্ষত বুকে চলছে পাহাড়ের বোবা কান্না!

বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত পাহাড়, টিলা, খাল, নদী বেষ্টিত প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর পরিবেশের এই চট্টগ্রাম। কিন্তু কতিপয় লোভী পাহাড় সন্ত্রাসের কবলে পড়ে দিন দিন নির্বিচারে পাহাড় নিধনের ফলে ঐতিহ্য হারাতে বসেছে এই অঞ্চলটি।

এসব দেখবালের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের মাঝে মাঝে ২/১ টি লোক দেখানো অভিযানের মাধ্যমে সামান্য কিছু আর্থিক জড়িমানা দিয়েই অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় অপরাধের মাত্রা দিনকে দিন আরো বেড়েই চলছে। এর কোন স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে রহস্যজনক মনে করছেন সচেতন মহল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাহাড় কেটে আবাসন তৈরি করার জন্য অনুমতি দিলেও আবার যেখানে অনুমতি নেওয়া হয়নি সেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাত্তাই দিচ্ছেনা এসব পাহাড় সন্ত্রাসীরা। আবার ভোটের রাজনীতির কারনে অনেক প্রভাবশালী নেতাও তাদের পক্ষে সাফাই গাইতে শোনা যায়। চট্টগ্রাম মহানগরীর চারদিকে চোখ ঘুরালেই এমন দৃশ্য চোখে পড়বে অহরহ। পাহাড়ের এই কান্না যেন পৌছায়না পরিবেশবাদীদের কান পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রাণকেন্দ্র দেবপাহাড় থেকে শুরু করলেই দেখতে পাবেন নির্বিচারে পাহাড় ও গাছপালা নিধনের মাধ্যমে সারি সারি করে তৈরি করা হয়েছে বহুতল আবাসিক ভবন। চকবাজার এলাকার পার্সিভ্যাল হিলে টিনের ঘেরা দিয়ে ৫৯ কাঠা পরিমান পাহাড় কয়েকমাস ধরে কেটে যাচ্ছিল এপিক প্রপার্টিজ লিমিটেড। সেখানে ‘এপিক ভুঁইয়া ইম্পেরিয়াম’ নামে ১২ তলাবিশিষ্ট একটি ভবনের প্রকল্প হাতে নেয় তারা।

গত শনিবার (১৭ জুলাই) দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে পাহাড় কাটার সময় এপিক প্রপার্টিজের নিয়োজিত চার শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে চকবাজার থানার পুলিশ। অথচ এই বিষয়টি নিয়ে চলতি বছরের ১০ মার্চ পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়কে অবহিত করেছিল স্থানীয়রা। রহস্যজনক কারনে পাহাড় নিধন কার্যক্রম বন্ধ করেনি পরিবেশ অধিদফতর। পাহাড় কাটার অভিযোগ উঠছে সিএমপির পুলিশের বিরুদ্ধেও।

শহীদ সাইফুদ্দিন (এসএস) খালেদ রোডেও পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে আবাসিক ভবন। চট্টগ্রামের পরিবেশ ভবনের বিপরীতে আকবরশাহ হাউজিং সোসাইটি, পরিবেশ ভবনের পাশেই ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল , ইউএসটিসি. উত্তর খুলশী, দক্ষিণ খুলশী, পশ্চিম খুলশী আবাসিক এলাকার অধিকাংশ আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড় কেটে। সম্প্রতি খুলশী এলাকায় অনুমোদন ছাড়াই পাহাড় কেটে স্যানমার প্রপার্টিজের একটি ভবন নির্মাণ করার প্রমান পায় পরিবেশ অধিদফতর। আকবর শাহ থানা এলাকায় রাজনীতির ছত্রছায়ায় নির্বিচারে পাহাড় নিধন করা হয় প্রতিনিয়ত। নগরীর লালখান বাজার এলাকাটি পাহাড় কাটতে কাটতে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক এলাকা যা দেখে অনেকেই বুঝতে পারবেনা এখানে কখনো পাহাড় ছিলো। আবার কিছু কিছু জায়গায় পাহাড় কাটা এখনো চলমান। এমনিভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে নগরীরর ঝাউতলা থেকে টাইগারপাস এলাকার বাটালি পাহাড়। সেগুন বাগানের পাহাড়ের চিহ্ন প্রায় নেই বললেই চলে। নগরীর বায়েজীদ থানা এলাকার বেশিরভাগ জায়গা পাহাড় বেষ্টিত। থানার আশেপাশে অনেক পাহাড় কেটে বানিয়ে ফেলা হয়েছে প্রায় সমতল ভুমি, গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ঘরবাড়ি ও দোকান-পাট। ছিন্নমুল নামের বায়েজীদের আরেকটি বৃহৎ অংশে চোখের সামনে সরকারি পাহাড় নিধন করে একশ্রেনির প্রভাবশালীরা প্লট বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিলেও যেন কারোর কোন মাথা ব্যথা নেই । আবার এসব দখল-বেদখল নিয়ে মাঝে মাঝে শুরু হয় দাঙ্গা-হাঙ্গামাও হয় শক্তির প্রদর্শনি। যার ক্ষমতা বেশি সেই টিকে থাকেন দখল বাণিজ্যের এই আসরে। আবার সরকারি এসব পাহাড়ে নিশ্চিন্তে পেয়ে যান বিদ্যুতের সংযোগও।

পাহাড় নিধনের এই চিত্র শুধু শহরেই সীমাবদ্ধ নয় পাহাড়ের বিশাল বিশাল অংশ দখল করে কর্তনের মাধ্যমে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল বস্তি। পরিবেশ ধ্বংসের খেলায় মেতে উঠেছে কর্পোরেট কোম্পানীগুলোও। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সীতাকুণ্ড এলাকায়। বায়েজীদ লিংক রোডের পাশে বিশাল পাহাড় কেটে সমতল করে ফেলেছে স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ারস। এই অপরাধে মোটা অংকের জরিমানা করেছিল পরিবেশ অধিদফতর কিন্তু ফলাফল সেই পাহাড় কাটাতেই বহাল। মিরসরাই সোনা পাহাড়ের একটি বড় অংশ কর্তন করেছে বিএসআরএম নামের একটি রড উৎপাদনকারী কোম্পানী।

পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে নির্বিচারে পাহাড় খোদাই চলতে থাকলে আগামী পাঁচ দশকের মধ্যে বিশেষ করে চট্টগ্রামে আর পাহাড় দেখা যাবে না। পাহাড় কাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। বন হারাচ্ছে তার চেনা রূপ। এ কারণে বনের নানা প্রাণী হাঁটছে বিলুপ্তির পথে।

পরিবেশ অধিদপ্তর সুত্রে জানা যায় মিরসরাই এবং সীতাকুন্ড উপজেলার অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুট পাহাড়ি এলাকা ধ্বংস করেছে কেএসআরএম, বিএসআরএম, পিএইচপি ফ্লোট গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, গোল্ডেন ইস্পাত, ইলিয়াস ব্রাদার্স (এমইবি ব্রিক্স) এবং আবুল খায়ের গ্রুপ। এই ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময়ে জরিমানা করা হলেও, তাদের পাহাড় কাটা বন্ধ হয়নি।

পাাহাড় কাটার অপরাধে গোল্ডেন ইস্পাত, বিএসআরএম, কেএসআরএম এবং পিএইচপিকে দুইবার করে জরিমানা করা হয় ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে। আবুল খায়ের গ্রুপকে জরিমানা করা হয় ২০১৮ তে এবং ইলিয়াস ব্রাদার্স ২০১৭ সালে একবার জরিমানা করা হয়েছিল।

দেশের সর্ববৃহৎ ইস্পাত কারখানা বিএসআরএম চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে চিটাগং পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করার সময় ১ লাখ ৫ হাজার বর্গফুট পাহাড় ধ্বংস করে। এই ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর কোম্পানিটিকে ৫২ লক্ষ টাকা জরিমানা করে। পরিবেশ অধিদপ্তর কেমসআরএমকে ৫ লাখ, পিএইচপিকে ৪ লাখ, গোল্ডেন ইস্পাতকে ৪ লাখ ৮০ হাজার এবং আবুল খায়ের গ্রুপকে ৮ লাখ ৩৬ হাজার টাকা জরিমানা করে । পুরো একটি পাহাড় ধসিয়ে ফেলার অপরাধে ইলিয়াস ব্রাদার্সকে সর্বোচ্চ সাড়ে ২৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এই ব্যপারে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল দৈনিক আমার সময়কে বলেন আইনের ফাঁকে অনেক পাহাড় সন্ত্রীরা পার পেয়ে যায় । বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামন্য জরিমানাতেই অভিযোগের সমাপ্তি ঘটে। এসব পাহাড় দস্যুদের সাথে অনেক সরকারি কর্মকর্তারও যোগসাজস রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন পাহাড় কর্তনকারীর সাথে সহায়তাকারীদেরও দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির আওতায় আনা গেলে পাহাড় কাটা কিছুটা হলেও রোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় পরিবেশ আইনে জরিমানা ছাড়াও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরিবেশ আদালতে মামলা করা যায়। পাহাড় কাটার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও এমন শাস্তি কেউ পেয়েছে বলে আমার জানা নেই।

এব্যপারে পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম মেট্রো কার্যায়ের পরিচালক নুরুল্লাহ নুরীর মোবাইলে কল ও বার্তা দিয়েও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

পরিবেশ অধিদফতর চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক জমির উদ্দিন দৈনিক আমার সময়কে বলেন আমরা পাহাড় কাটা ও পরিবেশ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছি। অভিযান করে বন্ধ করছি জরিমানা করছি আদালতে মামলাও করেছি। তবে লোকবল সংকটে অনেকেই আমাদের নজর ফাঁকি দিয়ে অপকর্ম করে থাকে কিন্তু আমরা জানার সাথে সাথেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি।

নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে বৃহত্তর চট্টগ্রামে নিয়মিতই ঘটছে পাহাড়ধসের ঘটনা। নিকট অতীতে ২০১৭ সালের ১৩ জুন সবচেয়ে প্রলয়ংকরী পাহাড়ধসের ঘটনায় দেশ দেখেছিল মৃত্যুর মিছিল। সেই বছর বৃহত্তর চট্টগ্রামে এক দিনেই ১৪২ জন এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারিয়েছিল। এদের মধ্যে ১২০ জনই ছিল রাঙামাটির। উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে মাটিচাপায় জীবন দিয়েছিলেন পাঁচ সেনা সদস্যও।