কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সারাদেশে ৬শ’ গুদাম নির্মাণের উদ্যোগ

কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সারাদেশে ৬শ’ গুদাম নির্মাণ করা হবে। মূলত কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে সঙ্কট নিরসনে স্থায়ী সমাধানে এমন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওই গুদামগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে নির্মাণ হবে। মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কোরবানির দিন তাৎক্ষণিক বিক্রি না করে আহরিত কাঁচা চামড়া ভাল দাম পেতে গুদামে ৩ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারবে। আগামী কোরবানি ঈদের আগেই সরকার বড় আকারের ৪টি মডেল গুদাম নির্মাণ করতে চাচ্ছে। তারপর পর্যায়ক্রমে সারাদেশে ধারণ ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩ আকারের গুদাম নির্মাণের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ওই লক্ষ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে প্রান্তিক ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য চামড়া সংরক্ষণাগার নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৭৫ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা সরকারি ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেসরকারী খাত থেকে প্রকল্পটির সফল বাস্তবায়নে বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হবে। ওসব গুদাম নির্মিত হলে চামড়া নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি চিরদিনের মতো বন্ধ হবে। ফলে ব্যবসায়ীরা পাবে ন্যায্যমূল্য। পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসায়ী এবং ট্যানারি মালিকদের রশি টানাটানিতে কোন চামড়া নষ্ট হবে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, কোরবানির কাঁচা চামড়ার ন্যায্যদাম নিশ্চিত করার পাশাপাশি ওই শিল্প খাতটির বিকাশে ‘কমিউনিটি পর্যায়ে প্রান্তিক ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য চামড়া সংরক্ষণাগার’ প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী কোরবানিতে যাতে কোনভাবেই চামড়া নিয়ে কারসাজি না হয় ওই লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কারণ দেশের রফতানি বাণিজ্যে গার্মেন্টস শিল্পের পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চামড়া শিল্প খাত। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে কোরবানির চামড়া নিয়ে কারসাজির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এ শিল্প খাতটি ইমেজ সঙ্কটে ভুগছে। ফলে চামড়া খাতের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজার ধরে রাখা এখন চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন বাস্তবতায় সরকারী-বেসরকারী খাতের অংশীদারিত্বের (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ-পিপিপি) ভিত্তিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকার সহায়তাকারী হিসেবে বেশি ভূমিকা পালন করবে। তার পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যাবতীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান করবে। তবে বেসরকারী খাতের ওপর গুদামগুলো নির্মাণ ও দেখভালের পুরো দায়-দায়িত্ব থাকবে। বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তারা সরকারের সঙ্গে পিপিপির ভিত্তিতে প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ করে লাভবান হবে। প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সেবার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে সার্ভিস চার্জ প্রদান করবে। তাতে করে সারাদেশে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।
সূত্র জানায়, সবচেয়ে বেশি চামড়া আহরিত হয় এমন সব গ্রাম ও ইউনিয়ন পর্যায়েও চামড়া সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় গুদাম নির্মাণ করা হবে। ওই লক্ষ্যে চামড়া আহরণের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে সারাদেশে তিন আকারের গুদাম নির্মাণের কথা জানানো হয়। বড় আকারের গুদাম নির্মাণ হবে ৪০টি, মাঝারি মানের ৫০টি এবং ৫১০টি ছোট আকারের গুদাম নির্মাণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। চামড়ার হাব হিসেবে ঢাকার সাভার, উত্তরবঙ্গের নাটোর, বাণিজ্যিক রাজধানরী চট্টগ্রামকে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। চামড়া সংরক্ষণে ওই প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করে করে সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি) ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। আইআইএফসি সরকারের একটি সুপরিচিত পরামর্শ দাতা সংস্থা। যা সরকারি ও বেসরকারি সংগ্রহ, পিপিপি লেনদেন, গবেষণা, জরিপ, আর্থিক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সহায়তা পরিষেবা সরবরাহ করে থাকে। ইতিমধ্যে আইআইএফসির উর্ধতন কর্মকর্তারা চামড়া সংরক্ষণের প্রকল্প বাস্তবায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। ওই বৈঠকে আইআইএফসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশের চামড়া শিল্প বিকাশে এমন ধরনের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। তবে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বুয়েট প্রতিনিধিরাও জানিয়েছেন, চামড়া সংরক্ষণ প্রকল্পটি গ্রহণ করা সঠিক ও সময়োপযোগী প্রকল্প। শিল্প বিকাশ ও রফতানি খাত শক্তিশালী করতে চামড়া সংরক্ষণ প্রকল্পটির একটি ভ্যালু রয়েছে। তাতে বিশ্ব বাজারে এ খাতের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের ভাল দাম পাবে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা।
সূত্র আরো জানায়, কোরবানির সময় প্রায় সোয়া কোটি পিস চামড়া আহরিত হয়ে থাকে। তার মধ্যে ৪০-৪৫ লাখ গরুর চামড়া পাওয়া যায়। বাকি চামড়া ছাগল, বকরি ভেড়া ও মহিষসহ অন্য গবাদি পশুর। আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সারা বছরে আরো সোয়া কোটি কাঁচা চামড়া আহরিত হয়। কিন্তু কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে দেশে কোন সংরক্ষণাগার নেই। পোস্তার আড়ত ও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর বাইরে কাঁচা চামড়া মজুদ করে রাখার মতো কোন অবকাঠামো নেই। আর এ কারণেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়ে থাকে। এবার কমিউনিটি পর্যায়ে প্রান্তিক ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য চামড়া সংরক্ষণাগারের মাধ্যমে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্মিত গুদামে চামড়া সংরক্ষণে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গুদামে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করে ৩ মাস ধরে তা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হবে। তার পরও ভাল দাম না পেলে ওসব লবণ দেয়া চামড়া বিদেশে রফতানির সুযোগ দেবে সরকার। ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আগামী বছর থেকে চামড়া নিয়ে ব্যবসায়ীদের ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হবে। প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের আর চামড়া ফেলে দিয়ে মূল্যবান জাতীয় সম্পদ নষ্ট করতে হবে না। তাছাড়া ওই প্রকল্পে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ, সঠিক পদ্ধতি মেনে পশু থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নেয়া, নিয়ম মেনে লবণ দেয়া, বর্জ্য দ্রুত অপসারণ এবং স্থাস্থ্যবিধি রক্ষা করে চামড়া সংরক্ষণ করার প্রশক্ষণ দেয়া হবে। ওই কারণে পুরো প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সর্বপ্রথম ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়। ওই লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় সরকারী উদ্যোগে জেলা, উপজেলা ও কোন কোন ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে গুদাম ও ছাউনি নির্মাণ করে দেয়া হবে। একই সঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে কি পরিমাণ ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ী এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে তার একটি সঠিক পরিসংখ্যানও করা হচ্ছে। প্রশিক্ষিত করা গেলে সহজে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লবণযুক্ত চামড়া মজুদ ও সংরক্ষণ করতে পারবে। আর কোরবানি পরবর্তী সুবিধাজনক সময়ে চামড়াগুলো দর কষাকষির মাধ্যমে বিক্রি করতে পারবে ব্যবসায়ীরা। ফলে দেশের সর্বত্র কোরবানির চামড়ার ন্যায্যদাম নিশ্চিত হবে। ফলে চামড়া নিয়ে যে কোন নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।
এদিকে কাঁচা চামড়া নিয়ে কারসাজি হওয়ায় ওই শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যদাম নিশ্চিত হচ্ছে না। দেশে চামড়াজাত পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কমছে ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়ার দাম। ওই কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ভোক্তারা। ব্যবসায়ীরাও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। চামড়া খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এ শিল্পের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে কাঁচা চামড়া সঠিক দামে বেচাকেনা হতে হবে। ব্যবসায়ীদের কোরবানির বিনামূল্যে চামড়া নেয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। চামড়া শিল্প খাতের বিকাশে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরী গড়ে উঠেছে। হাজারীবাগ থেকে সাভারে দেশের ১৫৪টি ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরিত হয়েছে। ট্যানারিগুলো পুরোদমে ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া উৎপাদন করছে। ওই চামড়ার ওপর দেশে গড়ে উঠেছে জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট ও জ্যাকেটের মতো চামড়াজাত পণ্যসামগ্রীর কারখানা। ওসব পণ্য দেশীয় চাহিদার পাশাপাশি বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে। তাছাড়া ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়। রূপকল্প-২০২১ সালের মধ্যে ৪৩ হাজার কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু করোনাসহ নানা সঙ্কটের কারণে উদ্যোক্তারা চামড়া রফতানিতে তেমন সুখবর দিতে পারছে না। তবে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা একটি জরুরি বিষয়। পরিকল্পিতভাবে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ করা গেলে চামড়া পাচার রোধ করা সম্ভব হবে। তাছাড়া ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়ার উৎপাদন বাড়বে।
অন্যদিকে চামড়া শিল্প বিকাশে বেশ কয়েকটি নীতিমালা এবং সাভারের হেমায়েতপুরে শিল্পনগরী গড়ে তোলা হলেও কোরবানির চামড়া নিয়ে অরাজকতা বন্ধ হয়নি। অথচ দেশের রফতানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে চামড়া শিল্প খাত। ট্যানারিতে উৎপাদিত ক্রাস্ট ও ফিনিশড লেদারের পাশাপাশি দেশ থেকে বিদেশে বিপুল পরিমাণ চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়ছে। তাছাড়া দেশেও চামড়ার বিপুল চাহিদা রয়েছে। চামড়াজাত পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে এ শিল্প খাতের অবদান অনেক। সরাসরি চামড়া শিল্প খাতে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর ওই ৫ লাখ মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখ মানুষের ভাগ্য জড়িত। কিন্তু কোরবানি আসলেই কম দামে চামড়া কেনার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। গত দু’বছর ধরে কোরবানির চামড়া পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। চামড়া বেচতে না পারে রাগে-ক্ষোভে দেশের সাধারণ মানুষ কোরবানির চামড়া নদী, সাগর ও রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে। তাতে করে চরম সঙ্কটে এ খাত। এমন অবস্থায় সরকারি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব ড. মোঃ জাফর উদ্দীন জানান, চামড়া জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করতে হবে। কোরবানির সময় সারাবছরের অর্ধেক চামড়া সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে সঠিক দাম নিশ্চিত হয় না। চামড়া নষ্ট হওয়ার খবর আসে। আর তাই ওই সমস্যা সমাধানে একটি স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কমিউনিটি পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরীক্ষামূলক দু’তিনটি জেলায় চামড়া সংরক্ষণ করে গতবছর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভাল দাম পেয়েছে। আইআইএফসি ও বুয়েট থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পরই আশা করা যায় দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে। পিপিপির ভিত্তিতে দেশের অনেক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। চামড়া সংরক্ষণ প্রকল্পটিও পিপিপিতে নেয়া হয়েছে। তাতে করে বেসরকারী খাতই বেশি লাভবান হতে পারবে।