রাজনৈতিক নেতা ও বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় কুষ্টিয়ায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ডজনখানেক কিশোর গ্যাং। ভিন্ন ভিন্ন ভীতিকর অশ্লীল নাম এবং নিজ নিজ গ্যাংয়ের টি শার্ট পরেই জেলার অলিগলিতে এসব গ্যাংয়ের আধিপত্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্যে অস্ত্র ও মাদক সেবনের ছবিসহ লাগামহীন এসব গ্যাং। পাড়ার অলিতে গলিতে ব্যানার ফেস্টুন বড় বড় মাইক্রোতে বক্স ভাড়া করে ডিজে গানের সঙ্গে শক্তি প্রদর্শনে মাঝে মধ্যেই শহরে প্রকাশ্যে মহড়া দেয় তারা। বিএসবি, হান্টিং বয়, কেবিএস, ব্ল্যাক সিপসহ নানা নামের কিশোর গ্যাংকে রাজনৈতিক নেতারা টেন্ডারবাজিসহ নানা অপকর্মে এদের ব্যবহার করছেন। এদের মধ্যে সকল কিশোর গ্যাংকে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের বড় ভাই। এ ছাড়াও নেতাদের শেল্টারে থাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মাদক ব্যবসাসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও বড় ভাইদের ছত্রছায়া থাকায় দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে তারা। তবে পুলিশ বলছে, আর কোনো ছাড় দেয়া হবে না। কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা আপডেট করা হচ্ছে। তালিকা ধরে অভিযান চলবে। গত বুধবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে শহরের থানাপাড়া বাঁধ সংলগ্ন শেখ রাসেল সেতুর নিচে অবস্থিত রিভার ভিউ ফুড কর্নার নামক একটি রেস্তরাঁয় ঢুকে ম্যানেজারসহ ৩ জনকে ছুরিকাঘাত করেছে দুর্বৃত্তরা। ছুরিকাঘাতে আহতরা হলেন- রেস্তরাঁর ম্যানেজার তুষার (২৩), প্রধান বাবুর্চি শিমুল (২৫) ও সহকারী বাবুর্চি শুভ (২২)। আহতদের কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রেস্তরাঁর ম্যানেজার তুষারের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছে কর্তব্যরত চিকিৎসক। জেলার সবচেয়ে বড় কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছে এস কে সজীব। শহরের এক নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় পুলিশও তার ধারে কাছে যেতে পারেনি। শহরের অধিকাংশ অপকর্ম হয়েছে তার নেতৃত্বে। গত ৩১শে জানুয়ারি তার নেতৃত্বেই মিলন হোসেন (২৭) নামের এক যুবককে অপহরণের পর হত্যা করে লাশ ৯ টুকরা করা হয়। ৩রা ফেব্র“য়ারি সকালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পদ্মার চরের চারটি জায়গা থেকে লাশের ৯ টুকরা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওইদিন সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন মিলনের মা শেফালি খাতুন। মামলায় কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। এ ঘটনায় ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত নেতা কিশোর গ্যাং প্রধান এস কে সজীবসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা হলো- সজীব, লিংকন, সজল, ইফতি, জনি ও ফয়সাল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোর দলের সদস্যদের বেশির ভাগই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের। ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের মিছিলে আসা-যাওয়া ঘিরে তারা এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করে। এরপর রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ দাপটে নানা অপকর্ম শুরু করে। এলাকা ভাগ করে নিজ নিজ গ্যাংয়ের আধিপত্য গড়ে তুলেছে তারা। পুলিশের একটি সূত্রে জানা গেছে, শুধু কুষ্টিয়া শহরেই কিশোরদের ১৩টি দল রয়েছে যারা শহরে প্রতিনিয়ত ত্রাসের রাজত্ব করে যাচ্ছে। এতে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে। প্রতিটি দলে ২০ থেকে ২৫ জন করে সদস্য রয়েছে। এসব দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে ২০ বছরের বেশি বয়সী তরুণরা। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং, থানাপাড়া, সিঙ্গার মোড়, ইসলামিয়া কলেজ ও ছয় রাস্তার মোড়, পূর্ব মজমপুর, সাদ্দাম বাজার, সকাল-সন্ধ্যা, ঝাউতলা, হাসপাতাল ও আলফার মোড় এবং হরিপুর সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম পাশে এসব দলের তৎপরতা বেশি। শহরের বাড়ির সীমানা প্রাচীরে এসব দলের নামে চিকাও রয়েছে। কুষ্টিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের আপডেট তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কয়েক বছর আগের চেয়ে এখন এই সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তালিকা ধরে অভিযান চলবে। এদিকে কিশোর গ্যাং প্রধান সজীবের নেতৃত্বে মিলন হত্যার ঘটনায় আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে কিশোর গ্যাং প্রসঙ্গ। মিলন হত্যাকাণ্ডে আটক হওয়ার পর সজীবের নানা অপকর্ম বেরিয়ে আসছে। এস কে সজীবের নাম সজীব শেখ। তার বাবার নাম মিলন শেখ। শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার হরিবাসর এলাকায় তাদের বাড়ি। সজীবের নামে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মাদক, চাঁদাবাজি, হামলাসহ নানা অভিযোগে ১৩টি মামলা আছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে মারধরের মামলায় তার দুই বছরের সাজাও হয়েছিল। ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এস কে সজীব কলেজে পড়ালেখা না করেও হঠাৎ করে ছাত্রলীগের পদ পেয়ে যায়। ইয়াসির আরাফাত ও সাদ আহাম্মেদের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে ২০১৭-১৮ সালের দিকে প্রথম সহ-সম্পাদকের পদ পায়। তখন থেকেই শহরের হাউজিং এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে চাঁদাবাজি, মারধর, মাদকের কারবারসহ নানা অপকর্ম শুরু করে। এরপরও নেতাদের সুপারিশে জেলা ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটিতে সহ-সভাপতির পদ পেয়ে যায় সে। এরপর সজীব আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। শহরে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিতে দেখা যায়। জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জের ওপর হামলাসহ নানা অপকর্মের কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। শহরের সাদ্দাম বাজার এলাকায় এক যুবককে ছুরিকাঘাত করার সময় সজীবও গুরুতর আহত হয়েছিল। ওই ঘটনায় মামলাও হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি’র কার্যালয় ও মিছিলে তার নেতৃত্বে একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। শহরের হাউজিং এলাকায় চাঁদাবাজি ও হামলার একাধিক ঘটনা আছে। সেসব ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। ছাত্রলীগের নেতারা জানান, ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তুষারের হাত ধরে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করে সজীব। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচনী প্রচারণায়ও অংশ নেয়। সেখানে তাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। ওই মঞ্চে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত, সাধারণ সম্পাদক মানব চাকীসহ অন্য নেতারাও ছিলেন। তখন তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে আমি ছাত্রলীগ করতাম, এখন স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতি করি।’ দলের একটি সূত্র জানায়, এস. কে সজীবকে নেতারা নানা অপকর্মে ব্যবহার করেন। তার ক্যাডার বাহিনী আছে। মিছিল-মিটিংয়ে কিশোরদের নিয়ে আসে। আগে ছাত্রলীগ করলেও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন কমিটিতে তুষার সভাপতি হলে আবার তার ছত্রছায়ায় নানা অপকর্ম করে আসছিল। সর্বশেষ সজীবকে গ্রেপ্তারের রাতেও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি তুষারের সঙ্গে কুষ্টিয়া পলিটেকনিকে একসঙ্গে ছিল। এরপরই তাকে আটক করে পুলিশ। ইয়াসির আরাফাত বলেন, সে (সজীব) আমার সঙ্গে রাজনীতি করে, এটা ঠিক। শুক্রবারও পলিটেকনিকে আমরা গিয়েছিলাম, সেও ছিল, কিন্তু তার ব্যক্তিগত কোনো অপকর্মের দায়ভার তার নিজেরই নিতে হবে।
Leave a Reply