কর্ণফুলীর দূষণ রোধ ও নাব্যতা রক্ষায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ ভূমি মন্ত্রীর

জাহাঙ্গীর আলম,বিশেষ প্রতিনিধিঃ ভূমিমন্ত্রী সাইফ্জ্জুামান চৌধুরী চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ রোধ, অবৈধ দখল বন্ধ ও নাব্যতা রক্ষায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ(চবক)কে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, কর্ণফুলীর বর্তমান অবস্থা ভয়াবহ। দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর যেখানে অবস্থিত সে নদীর এ অবস্থা জাতির জন্য অশনি সংকেত। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এ নদীর কোন অস্তিত্ব থাকবেনা। তাই এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। এখনই প্রণীত মাষ্টার প্লান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। চবক হচ্ছে কর্ণফুলীর অথরিটি। কাজেই চবককে বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।

মন্ত্রী আজ চট্টগ্রামে চ্যানেল আই, চট্টগ্রাম কর্তৃক “কর্ণফুলীর তীরে দখল ও দূষণ মুক্ত রাখা এবং অবিলম্বে কর্ণফুলী নদীর পরিকল্পিত ড্রেজিং ” বিষয়ে কর্ণফুলির পাড়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।

গোল টেবিল বৈঠকে চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও নাগরিকবৃন্দ, কর্ণফুলী ও হালদা নদী বিষেষজ্ঞ, জেলা প্রশাসন, নগর পরিকল্পনাবিদ, সিটি কর্পোরেশন, ওয়াশা, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বন্দর ব্যবহারকারীসহ সাম্পান মাঝিদের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিগন অংশ নেন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাংবাদিক আলীউর রহমান।

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, মিজোরামের লুসাই পাহাড় হতে উৎপন্ন এ নদীর বাংলাদেশ অংশের দৈর্র্ঘ্য ১৬১ কিঃমিঃ । এর উভয় পাশে ১২টি উপজাতির বসবাস। এ নদী বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের ধারক এবং চট্টগ্রাম বন্দর তথা জাতীয় অর্থনীতির সঞ্চালক। জিডিপি’র ১৩ শতাংশ এ নদীর অবদান। এতে বলা হয়, জেলা প্রশাসনের সার্ভে অনুযায়ী প্রতিদিন ৭৩০টি কারখানা, ১৫০টি বড় আকারের শিল্প প্রতিষ্ঠান, কয়েকটি ট্যানারি, ২৬টি টেক্সটাইল মিল, ২টি রাসায়নিক কারখানা, ৫টি মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, ৫টি সাবান কারখানা, ২টি তেলা শোধনাগার, সিইউএফএল, কাফকো ও চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের ৭৬০ মেঃটঃ বিষাক্ত বর্জ্য কর্ণফুলীতে পড়ছে। এছাড়া এ নদীতে চলাচলরত ১ হাজার ২০০টি ছোট জাহাজ, ৬০-৭০টি ওয়েল ট্যাংকার, সাড়ে ৩ হাজার ইঞ্জিন চালিত নৌকার বর্জ্য প্রতিনিয়িত কর্ণফুলীতে নিঃসরণ হচ্ছে। ফলে ২০ প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া নগরবাসীর ব্যবহৃত পলিথিন পড়ে কর্ণফুলীর তলদেশে প্রায় ৬ ফুট পর্যন্ত গভীরতা কমে গেছে। এসব পলিথিনের কারনে সুষ্ঠুভাবে ড্রেজিং পর্যন্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

বৈঠকে নদী বিশেষজ্ঞগণ বলেন, কাপ্তাই বাঁধ এবং ৪টি প্রধান স্প্যান ব্রীজ থাকার কারনে এ নদী প্রতিনিয়ত মরে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ কালুরঘাট সেতু নির্মিত হলে তাতে যেন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা এবং এ নদীর জলজ সম্পদ ও ইকো সিস্টেম রক্ষায় এখনই কর্ণফুলী বাঁচাতে আশু পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান জানান।

সভায় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, আর এস সার্ভে অনুযায়ী কর্ণফুলীর তীরে ২ হাজার ১শ ১২টি অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রƒয়ারি মাসে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ করে নদীর ১০ একর জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে রিট মামলার কারনে উচ্ছেদ বন্ধ রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা পাওয়া গেলে সে মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অবৈধ দখলদারদের তালিকা জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

ভুমি মন্ত্রী বলেন, কর্ণফুলীতে যে পরিমাণ পলিথিন রয়েছে তা নগরবাসীরাই ব্যবহার করেছে। কর্ণফুলী রক্ষায় নগরবাসীকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। শরীরের অঙ্গের মতো কর্ণফুলীর যতœ নিতে হবে। তিনি বলেন, লাইটারেজ জাহাজগুলো নদীতে বিশৃংখলভাবে পার্ক করা থাকে। এর কারনেও নদীর ¯্রােতের গতি কমে যায়। কাজেই লাইটারেজ জাহাজগুলোর শৃংখলা রক্ষায় চবককে ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিকল্পিত শিল্পায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইটিপি থাকতে হবে। স্যুয়ারেজের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ওয়াশা’কে দায়িত্ব নিয়ে কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের যে অভাব রয়েছে তা দুর করতে হবে।

কর্ণফুলী রক্ষায় এ জাতীয় আয়োজনের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে তিনি এ বৈঠকের ফলোআপ বৈঠক আয়োজন করার জন্য চ্যানেল আইয়ের প্রতি অনুরোধ জানান।

চ্যানেল আই, চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী ফরিদ এর সভাপতিত্বে গোল টেবিল বৈঠকে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক, চবক চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল জুলফিকার আজিজ, সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ, ওয়াশা’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার একেএম ফজলুল্লাহ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. দেলোয়ার হোসেন, চেম্বার সহসভাপতি তরফদার রুহুল আমিন, বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি এম এ সালাম, স্থানীয় কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব, আইবিএফবি’র সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব, হালদা নদী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া, কর্ণফুলী নদী বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. ইদ্রিস আলী, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান প্রমূখ অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন।