ওয়েবসাইট তৈরির আগে আপনাকে যা যা জানতে হবে

ওয়েবসাইট তৈরির আগে আপনাকে যা যা জানতে হবে
মোহাম্মদ ইসরাফিলঃ  আপনার যেকোন ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠানকে দেশ ও বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার-প্রসার, ক্রয়-বিক্রয় ও সেবা প্রদান করতে অবশ্যই আপনার একটি ওয়েবসাইট প্রয়োজন। কিন্তু আমরা আসলে ওয়েবসাইট তৈরির প্রসেস সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছি না। আবার অনেক সময় দেখা গেছে, অনেক বেশী জানার ফলে জটিল মনে করে বা কিছুই জানি না ভাব ধরে আমরা ওয়েবসাইট তৈরির আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি বা ওয়েবসাইট তৈরি করেও কোন কাজে লাগাতে পারছি না। তাই আজকের এই লেখায় আমি সহজভাবে কিছু বিষয় তুলে ধরবো! ওয়েবসাইট তৈরির আগে আপনাকে যা যা জানতে হবে।
১. ব্যবসায়িক পরিকল্পনাঃ একটি ওয়েবসাইট তৈরির আগে অবশ্যই আপনাকে লিখিতভাবে ১/২/৩ বছরের পরিকল্পনা দাড় করাতে হবে। আপনি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কিভাবে আগাবেন! কি প্রোডাক্ট/সেবা নিয়ে কাজ করবেন। কিভাবে মার্কেটিং করবেন! কোথায় কোথায় ইনভেস্ট করবেন, কিভাবে মুনাফা অর্জন করবেন ইত্যাদি। একটি অফলাইন ব্যবসায় যেভাবে আপনি এগিয়ে যেতে চান! তার থেকে দ্বিগুন বেশী এগিয়ে যেতে পারবেন অনলাইনে। কেননা, ইন্টারনেট কোন নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবন্ধ না। আপনি চাইলে আপনার ঘরে বসেই পৃথিবীর যেকোন যায়গায় ব্যবসা করতে পারবেন। কোন পরিকল্পনা ছাড়া ওয়েবসাইট মানেই ছাদ ছাড়া বিল্ডিং তৈরির সমান।
২. রিকোয়ারমেন্টঃ বিয়ে বাড়িতে অবশ্যই দেখেছেন, বরযাত্রী কতজন আসবে! তা জেনেই রান্না করা হয়! কারণ, এতে বেশি লোক আসলেও সমস্যা আবার কম লোক আসলেও সমস্যা। ঠিক তেমনই ওয়েবসাইট তৈরির আগে অবশ্যই আপনাকে ওয়েবসাইট তৈরির রিকোয়ারমেন্ট ও বাজেট লিখিত আকারে ঠিক করে নিতে হবে। এতে আপনার ও ওয়েবসাইট নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের উভয়ই লাভবান হবেন। মূলত, আপনি ইন্টারনেটে ব্যবসা করবেন ওয়েবসাইটের মাধ্যমেই। একেক ওয়েবসাইটের একেকরকম ফিচার। ফেসবুকে যেসকল সুবিধা গুলো পাচ্ছেন, ইউটিউবে সেইসকল সুবিধা গুলো দেওয়া হচ্ছে না। গুগলে গিয়ে কিছু সার্চ করলেই পাচ্ছেন নানান রকম তথ্য ও ওয়েবসাইটের লিংক। ইউটিউবে পাচ্ছেন ভিডিও, প্রথম আলোতে পাচ্ছেন নিউজ পড়ার সুবিধা অন্যদিকে পায়রা সফট ওয়েবসাইট থেকে পাচ্ছেন ওয়েব সাইট তৈরির সুবিধা। তাই প্রথমত, আপনাকে লিখিত আকারে ডকুমেন্ট সাজাতে হবে! আপনার ওয়েবসাইটে কি কি ফিচার থাকবে। আপনার ওয়েবসাইট কি রকম হবে। যখনই আপনি কোন রিকোয়ারমেন্ট ছাড়া ওয়েবসাইটের অর্ডার করবেন! সেই কাজ কখনোই ভালো হবে না। নিজের মত হবে না।
৩. বাজেটঃ ফ্রী থেকে শুরু করে ১/২/৫/১০ /৫০ হাজার কিংবা ১ /৩/৫/১০ লক্ষের চাইতেও বেশী হতে পারে একটি ওয়েবসাইটের বাজেট। আপনার রিকোয়ারমেন্টের উপরই নির্ভর করে আপনার ওয়েবসাইটের বাজেট কেমন হবে। মনে রাখতে হবে! বাজেট যত বেশী হবে, মান তত ভালো হবে। এক্ষেত্রে আপনার বাজেটের উপর কোয়ালিটি যাচাই করতে হবে। আপনি কখনোই কোন আইটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার টাকা দিয়ে ১০ হাজার টাকার কাজ আদায় করতে পারবেন না আবার ১০ হাজার টাকায় ১ হাজার টাকার কাজ দিয়ে দিবে! সেটাও যাচাই করে দেখার দায়িত্ব একমাত্র আপনার নিজেরই। মানের প্রশ্নই যখন এসেছে, তাহলে মার্কেট এনালাইসিস করুন। অফলাইনে উদাহরণ হিসেবে দেখতে পারেন, গুলিস্তানের পণ্য, নিউ মার্কেটের পণ্য এবং বসুন্ধরার পণ্য। মান ও দামের পার্থক্য রয়েছে অনেক। তাই, ওমুক যায়গায় এর চাইতে অনেক কম দামে দিচ্ছে এমন কথা বলে! নিজে ঠকবেন না। আপনার সাধ্যমত, বাজেট ঠিক করেই ওয়েবসাইট তৈরি করুন এবং সেই বাজেট অনুযায়ী কোয়ালিটিই প্রত্যাশা করুন শুধু।
৪. যাচাই-বাচাইঃ একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম বাজেট দিবে আপনাকে। তাই কোথাও কম দামে দিচ্ছে আবার কোথাও বেশী দামে দিচ্ছে এমন অফারে বিচলিত না হয়ে বরং জানার চেষ্টা করুন, আসলে তারা এতো কম দামে দিচ্ছে কেনো? আবার এতো বেশী দামই কেনো নিচ্ছে? সাপোর্ট কোয়ালিটি কেমন? তাদের পোর্টফলিও কি কি? প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা কি কি? অনেকেই বলে, আমরা মার্কেটিং এর জন্য কম দামে ভালো সার্ভিস দিচ্ছি। কিন্তু এ কথাটি আসলে সত্য না। বরং সে আপনি জানেন না বিধায় সে আপনাকে একথাটি বলে শান্তনা দিচ্ছে। ৩০০ টাকার লাইট ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে কত যুগ ধরে। সেই লাইট ৩০০ টাকা হয়েছে কখনো? বাস্তবতা হলো সেই লাইটের দামই ১০০ টাকা। আপনার বাজেট যেমন হবে, তেমনই সার্ভিস দিবে। এর চাইতে বেশী দিবে না। কেননা, কেউ ব্যবসায় নিজের লাভ না রেখে প্রোডাক্ট সেল করে না। এসব বিষয় বুঝতে হলে, অবশ্যই আপনাকে কয়েকদিন গুলিস্তান গিয়ে কেনা-কাটা করতে হবে।
৫. ডোমেইন ও ওয়েব হোস্টিংঃ ওয়েবসাইট তৈরি করতে কি কি লাগে! সে বিষয় গুলোও আপনাকে জানতে হবে। ওয়েবসাইটের প্রথম পরিচয় হলো একটি ডোমেইন এবং ওয়েসাইটে কোন কনটেন্ট (লেখা, ছবি, ভিডিও, ফাইল ইত্যাদি) আপলোড করতে বা জমা রাখতে প্রয়োজন ওয়েব হোস্টিং। এই দুইটি ছাড়া আপনার ওয়েবসাইট ইন্টারনেটে কেউ দেখতে পারবে না। একই নাম অসংখ্য মানুষের হতে পারে! “ইসরাফিল” নামটা আমার নাম রাখা হলেও এই নামে একজন ফেরেশতা সহ আরও অসংখ্য মানুষের নাম রাখা হয়েছে। কিন্তু, ইন্টারনেটে একই ডোমেইন নামে দুইটা ওয়েবসাইট হতে পারে না। ডোমেইন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গুগল সার্চ করে নিন ২ মিনিট খরচ করে। খরচ যখন করবেনই তাহলে অবশ্যই এটা মনে রাখবেন! .com ডোমেইনে প্রতি বছর ৮৫০/৯৫০ টাকার বেশী খরচ হয় না। এছাড়াও ওয়েব হোস্টিং সাধারণত, এটা ভার্চুয়াল স্টোরেজ। যা আপনাকে ভাড়ায় চালাতে হবে। কোন এক ডাটা সেন্টার থেকে আপনাকে ১/২/৫ জিবি বা আপনার প্রয়োজন মত স্টোরেজ আপনাকে ভাড়ায় দিবে। যা আবার আপনাকে প্রতি বছর/মাসে রিনিউ ফি দিতে হবে। স্টোরেজ অনুযায়ী ওয়েব হোস্টিং এর দাম নির্ধারণ হয়। প্রতি বছর সর্বনিম্ন ১,০০০ থেকে শুরু করে ১০ লক্ষ+ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারেন। আপনার হোস্টিং যত বেশী হবে, আপনার সাইটের স্পীড তত ভালো হবে এবং তত বেশী ফাইল জমা করতে পারবেন। এছাড়াও ওয়েব হোস্টিং রিলেটেড আরও বিভিন্ন বিষয় আছে। সেগুলোও আপনাকে জানতে হবে।
৬. ওয়েব টেকনোলজিঃ ডোমেইন ও ওয়েব হোস্টিং নেওয়ার পর আপনাকে ভাবতে হবে কি দিয়ে আপনি ওয়েবসাইট টি তৈরি করবেন? ব্যাপার টা এমন! যায়গা-জমি সবই নিলেন বিল্ডিং তৈরি করার জন্য! এখন বাঁশ, ইট নাকি পাথর দিয়ে তৈরি করবেন? ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রেও আপনাকে ওয়েব টেকনোলজি গুলো ব্যবহার করতে হবে। যেমন, ফ্রি থেকে শুরু করে কাস্টম ও প্রি-বিল্ড বিভিন্ন টেকনোলজি আছে। উইক্স, গুগলের ব্লগার, ওয়ার্ডপ্রেস, ম্যাজেন্টো, বিভিন্ন ফ্রেমওয়ার্ক, পিএইচপি, লারাভেল, জাভা, পাইথন ইত্যাদি। আপনার বাজেট ও রিকোয়ারমেন্টের উপর নির্ভর করবে আপনি কোন টেকনোলজি ব্যবহার করবেন। তারপরও আপনার ইচ্ছে-অনিচ্ছে, সুবিধা-অসুবিধা তো আছেই। সবগুলো সম্পর্কে মোটামুটি বেসিক আইডিয়া নিতে হবে গুগল সার্চ করে।
৭. আয়ের প্রসেসঃ যেখানে লাভ নেই! সেখানে কোন গতি নেই। আপনার লাভ থাকলে অবশ্যই আপনি নিয়মিতভাবে ওয়েবসাইট পরিচালনা করে যাবেন। যদি কোন লাভই না আসে তাহলে কেনো হুদাই ওয়েবসাইটের উপর সময় নষ্ট করে যাবেন? তাই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বের করতে হবে আপনার আয়ের প্রসেস। ওয়েবসাইটের আয় টা যখন শুরু হবে, তখন সেটা আসবে গুনের নামতার মত। কিন্তু এই আয়টা শুরু করাই অনেক কষ্টকর। আপনি একটি ওয়েবসাইট তৈরি করলেন! সেটা কেউ কোটি কোটি ওয়েসাইটের মধ্যে খুজে পেল না? তাহলে কিভাবে আয় আসবে? বিশ্বে প্রতি মিনিটে ৫৭১ টি ডোমেইন (ওয়েবসাইটের নাম) রেজিষ্টেশন হচ্ছে। তাই এতো এতো ওয়েবসাইটের মধ্যে ভিজিটরদের আপনার ওয়েবসাইটে আনতে আপনাকে পেইড ও ফ্রী মার্কেটিং করতে হবে। নিজের বা অন্যের প্রোডাক্ট/সার্ভিস ক্রয়-বিক্রয় এবং গুগল ও লোকাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আপনি আয় করতে পারবেন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। কি কি করলে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেল হবে বা আপনার ওয়েবসাইটে মানুষ ভিজিট করবে সে সম্পর্কে ৬ মাস বা ১ বছরের পরিকল্পনা দাড় করিয়ে নিন এবং কাজ করুন। আর হ্যাঁ, মাত্র ৫/১০ টাকায় ওয়েবসাইট করে বা ওয়েবসাইট তৈরি করেই আয় করা শুরু করবেন এমন ধারণা থাকলে তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন। যদি এমনই হতো! তাহলে দেশে আর কোন রিকশাওয়ালাই থাকত না। সবাই ঘরে বসে বসেই ইনকাম করত।
৮. কাজের চুক্তিঃ প্রফেশনালভাবে কাজ করতে হলে অবশ্যই আপনাকে প্রফেশনাল কাউকে বা কোন প্রতিষ্ঠান কে হায়ার করতে হবে। আপনি যেমন প্রফেশনাল খুজছেন, তেমনই আপনাকেও প্রফেশনাল হতে হবে। বাজেট ও রিকোয়ারমেন্ট গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। অবশ্যই মৌখিকভাবে কোন কাজে যাবেন না। এতে কাজ তো হবেই না, উলটো আপনার ভালো সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। নিজের ওয়েবসাইট অন্যের উপর ছেড়ে দিয়ে কখনোই বলবেন না, যেভাবে ভালো হয়! সেভাবে করে দেন। বরং কিভাবে ভালো হবে সেটা আপনার ঠিক করে দিতে হবে। কেননা, সবার ভালো একরকম না। লেন-দেন, বাজেট, রিকোয়ারমেন্ট ইত্যাদি লিখিতভাবে অনলাইনে বা অফলাইনে সম্পূর্ণ করতে হবে। ফ্রীতে কোন কিছু পাওয়ার চেষ্টা করবেন না। কেননা, ফ্রীতে কখনোই ভালো জিনিস পাওয়া যায় না। সম্মানের ব্যাপারে, ক্লায়েন্টের কাছে যেমন ডেভেলপারদের গুরুত্ব! তেমনই ডেভেলপারদের কাছে ক্লায়েন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুসম্পর্ক বজায় রেখে আমরা উভয়পক্ষই সুন্দর একটি কাজ সম্পূর্ণ করতে পারি।
৯. ধৈর্য্য ও লক্ষ্যঃ ওয়েবসাইট তৈরির সাথে সাথেই আপনি লাভবান হয়ে যাবেন না। বরং আপনাকে লেগে থাকতে হবে। নিয়মিত কাজ করতে হবে। ওয়েবসাইট তৈরি করে নিখোঁজ হয়ে গেলে আপনার খরচ গুলো পানির মত ভেসে যাবে। তাই আপনাকে ধৈর্য্য ধরে লেগে থাকতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে। এতে অবশ্যই মুনাফা আসবে। কেননা, অন্যান্যরা পারলে, আমরা কেনো পারবো না। নিজ লক্ষ্যে অটুট থাকতে হবে।
১০. পরিশেষে আমি বলবো, বর্তমান বৈশ্বিক তথ্য প্রযুক্তির যুগে ওয়েবসাইটই আপনার ব্যবসার মূল চালিকা শক্তি হতে পারে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে খুব দ্রুত ও সহজেই যেকোন ব্যবসা মানুষের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে ও আস্থা গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। তাই বিশাল এই প্ল্যাটফর্মে সঠিক নিয়মে কাজ করলে অবশ্যই আপনি সফলতার সাথে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন। সকল ওয়েবসাইট উইনার বা যারা ওয়েবসাইট তৈরি করতে আগ্রহী তাদের জন্য রইল শুভ কামনা। যেকোন তথ্য ও পরামর্শের জন্য সার্চ করুন গুগলে কিংবা যোগাযোগ করুন আমার সাথে।
ধন্যবাদ।