1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
ঐতিহ্যের বরমী যেনো এক আতঙ্কের আতুঁড়ঘর ! অস্ত্রের ঝনঝনানি - দৈনিক আমার সময়

ঐতিহ্যের বরমী যেনো এক আতঙ্কের আতুঁড়ঘর ! অস্ত্রের ঝনঝনানি

আলফাজ সরকার, গাজীপুর
    প্রকাশিত : রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৫
এক যুগ আগেও শীতলক্ষ্যার তীরে অবস্থিত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী এলাকায় ছিল প্রশান্তির সুখ আর প্রকৃতির অনন্য রূপ। ৫২.০১বর্গ কি:মি: আয়তনের শান্ত ইউনিয়নটি এখন যেন অবৈধ অস্ত্রের নিরাপদ আখড়া হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বালু মহলের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অপকৌশলের ফলে সৃষ্ট চাপে এখানে গড়ে উঠেছে অপরাধের স্বর্গরাজ্য।ডাকাতি, অস্ত্র,চাঁদাবাজি ও মাদকের ভয়াল থাবায় শান্তিময় সেই বরমী এখন আতঙ্কের আতুঁড় ঘর। গত ছয় মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে কমপক্ষে দেশী বিদেশি মিলিয়ে ২০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।সবশেষ গত বৃহস্পতিবার ভোররাতে প্রবাস ফেরত এক বিএনপির নেতার কাছ থেকে পিস্তল ম্যাগাজিন ও দেশীয় অস্ত্রসহ বেশকিছু অস্ত্র জব্দ করা হয়।
সেনাবাহিনী ও পুলিশ সুত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (৫ নভেম্বর) যৌথবাহিনী সাবেক ছাত্রদল নেতা বরকুল গ্রামের এনামুল হক মোল্লার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকেসহ ৬সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি পিস্তল, ৩টি ম্যাগাজিন, ৪রাউন্ড গুলি, ৪টি ওয়াকিটকি, ৪টি বেটন, ২টি ইলেকট্রিক শক মেশিন, একটি হ্যামার নেল গান ও একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়। গাজীপুর আর্মি ক্যাম্পের দায়িত্বরত কর্মকর্তা মেজর খন্দকার মহিউদ্দিন আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গ্রেফতারকৃতরা হলো, শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের বরকুল গ্রামের মৃত আবদুল আহাদের ছেলে, বরমী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মক্কা মিসফালাহ সৌদি আরব বিএনপির সভাপতি এনামুল হক মোল্লা (৪৮), তার সহযোগী শওকত মীর, জাহিদ, মোস্তফা, সিদ্দিক, বুলবুল এবং তোফাজ্জল।
এর আগে, গত সেপ্টেম্বর মাসে একই ইউনিয়নের বরমীর ডুলিপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্রসহ ১ ব্যবসায়ীকে আটক করে র‍্যাব। এসময় তাকে ছিনিয়ে নিতে বেশ কিছু সময় র‍্যাবকে অবরুদ্ধ রাখা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ গিয়ে উদ্ধার করে। এর কিছুদিন আগে একাধিক মামলার আসামি সুমন শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এসময় পুলিশের গাড়ি আটকিয়ে তাকে ছিনিয়ে নেয় স্থানীয়রা। পরপর এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
পুলিশ বলছে,’ নদীপথের ৩দিকে যথাক্রমে ময়মনসিংহের গফরগাঁও, গাজীপুর কাপাসিয়া ও শ্রীপুরের সংযোগ স্থল হওয়ায় খুব সহজেই অপরাধীরা স্থান পরিবর্তন করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বরমীতে ঘটে যাওয়া,ডাকাতি, মাদক,অস্ত্র ও চাঁদাবাজ সংক্রান্ত বিষয়ে থানায় ১৬টি মামলা হয়েছে। যেখানে সারা উপজেলায় ১মাসে সবমিলিয়ে মামলা হয়েছে ৭০টি।
বিভিন্ন সংবাদপত্রের খবর থেকে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবে লুট হওয়া অস্ত্রগুলো এখনও পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি এবং এগুলো অপরাধীদের হাতে পড়ে অবৈধ ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। সচেতন মহল সন্দেহ করছেন, অনেক অস্ত্র অপরাধীদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে, যা আইনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকি। এগুলো দ্বারাই বরমীর মাদক ব্যবসা,বালুর ব্যবসা ও চাঁদবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে অপরাধীরা।
স্থানীয় আকরাম হোসেন বলেন,’বরমীর জনগণ নিরাপত্তার অভাবে ভুগছেন। বর্তমান এখানকার এনামুলের একটি গ্রুপ ও অন্যান্যদের আরেকটা গ্রুপের দ্বন্দ্ব দিনদিন বাড়ছে। অশান্ত হয়ে গেছে বরমী। আমরা এ থেকে মুক্তি চাই।’
মান্নান সৈয়দ নামের আরেকজন বলেন,’ বরমীতে যে হারে অস্ত্র দেখানো হচ্ছে মনে হয় ঘরে ঘরে অস্ত্র। এনামুলের মতো লোকের বাড়িতে যদি ৫টা আগ্নেয়াস্ত্র থাকে তাইলে আমরা কই আছি। অথচ সে হুজুর বেশে তার পিছে লোকের অভাব নেই। এমনকি আপনাদের মতো সাংবাদিকও তার পেছনে পেছনে ঘুরতো।’
অপরাধ বিশ্লেষক ও কলেজ শিক্ষক  হাবিবুর রহমান বলেন,’ শিল্পোন্নত শহরায়নের ফলে দিনকে দিন অপরাধ বেড়েছে। আমার প্রশ্ন এই অস্ত্রগুলো কোথা থেকে আসছে? কারা এগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে? যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও, অস্ত্রের উৎস উদঘাটন না হলে এই আতঙ্ক কমবে না। আধুনিক সভ্য সমাজের মানুষ চায় নিরাপত্তা, চায় শান্তি; কিন্তু অবৈধ অস্ত্রের ছায়া যেন তাদের দৈনন্দিন জীবনকে গ্রাস করছে।’
বিএনপি নির্বাহী কমিটির সহ-স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ও সম্প্রতি বিএনপি ঘোষিত গাজীপুর-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন,’ ইদানিং বরমী এলাকায় কতিপয় সন্ত্রাসীর অত্যাচার বেড়ে গিয়েছিল। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ইতোমধ্যে সেখানকার মূল হোতাকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা নিশ্চিত বলি সন্ত্রাসীর কোনো দলীয় পরিচয় নেই। তারুণ্যের অহংকার তারেক রহমান সন্ত্রাস,চাঁদাবাজ মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছেন। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন,’ আমার থানার সিংহশ্রী এলাকায় এমন কোনো অপরাধের খবর আমার জানা নেই। পুলিশ তৎপর রয়েছে।’
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহাম্মদ আব্দুল বারিক বলেন,’ বরমীতে এখনো পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। অন্যান্য ইউনিয়নের চেয়ে এখানে গত কয়েক মাসে মাদকসহ সর্বোচ্চ ১৬টি মামলা হয়েছে। অস্ত্র পাওয়া গেছে। বর্তমানে সেখানে আমরা মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছি। তবে, সেখানে বালু মহলের নিয়ন্ত্রণ নিতে কয়েকটি পক্ষের দ্বন্দ্ব চলছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পরিস্থিতি কিছুটা বিশৃঙ্খলা। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। অপরাধ যারাই করবে আমরা আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।’
গাজীপুরের পুলিশ সুপার ড.চৌধুরী যাবের সাদেক বলেন,’সমসাময়িক কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। আমরা এখনো ওই স্পটকে বিশেষ নজরদারিতে রেখেছি। কেউ অপরাধ করে ছাড় পাবেনা।’

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com