ঐতিহ্যপূর্ণ বলুহ দেওয়ানের মেলা শুরু, চলবে সপ্তাহব্যাপী

চৌগাছা প্রতিনিধিঃ যশোরের চৌগাছায় নারায়নপুর ইউনিয়নের হাজরানা গ্রামে সপ্তাহব্যাপী ঐতিহ্যবাহী পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) মেলা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে এ মেলা শুরু হয় এবং ঐ দিনেই ঐতিহ্যবাহি পীর বলু দেওয়ান মেলার শুভ উদ্বোধন করেছেন স্থানীয় সাংসদ বীরমুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অবঃ) ডাঃ মোঃ নাসির উদ্দিন।
উদ্বোধনকালে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মেলা পরিচালনা কমিটির সভাপতি বীরমুক্তিযোদ্ধা এসএম হাবিবুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ জাহিদুল ইসলাম, চৌগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রিফাত খান রাজিব,  চৌগাছা সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, জগীদেশপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তবিবার রহমান খান, জেলা পরিষদের সদস্য হবিবার রহমান, সিংহঝুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল বাদল, সুখপুকরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোতা মিয়া, উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহবায়ক শরিফুল ইসলাম, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক  এসএম সাইফুর রহমান বাবুল।
উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম হুসাইন, সাধারণ সম্পাদক বিএম শফিকুজ্জামান রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু আহম্মেদ, দপ্তর সম্পাদক হাসেম আলি, পৌর ছাত্রলীগ নেতা সৌরভ রহমান বিপুল। চৌগাছা সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি আশিকুজ্জান রিংকু, সাধারণ সম্পাদক মিকাইল হোসেন সোহেল সহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতা কর্মীরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, বলুহ দেওয়ানের ওরস উপলক্ষে মেলার নামে পুতুল নাচ, অন্ধকূপে গাড়ি চালানো, যাদু প্রদর্শনী মঞ্চ উচ্ছেদ করা হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী বলুহ দেওয়ানের ওরসে স্টল বাণিজ্যে ও নানা অসঙ্গতির অভিযোগ ওঠায় সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও ওসির নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়।
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী বলুহ দেওয়ানের ওরস উপলক্ষ্যে স্বাভাবিকভাবে লোকসমাগম হয়। সেখানে কিছু দোকানপাট বসে। সেই হিসেবে ওরসের অনুমতি দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এখানে মেলার কোনো অনুমতি নেই।
তিনি বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় সরেজমিনে গিয়ে অসঙ্গতির প্রমাণ পেয়েছি। এ সময় আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তায় পীর বলুহ দেওয়ান দাখিল মাদ্রাসা ও হাজরাখানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ থেকে সব স্টল উচ্ছেদ করা হয়। একই সঙ্গে পুতুল নাচ, অন্ধকূপে প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল চালানো, যাদু প্রদর্শনী, বন্ধ করে সরঞ্জামাদি জব্দ করা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য মহোদয় ২১ সদস্য বিশিষ্ট বলুহ মেলা পরিচালনা কমিটি করে দিয়েছেন। সেই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম হাবিবুর রহমানকে। কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমান্য ব্যক্তি রয়েছে। তারা পরিচালনা করবেন। তিনি আরও বলেন, বলুহ মেলা ইজারা দেয়ার সুযোগ নেই। এটি সরকারি পেরিফেরিভুক্ত করে আগামীতে ইজারা দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। যাতে সরকার রাজস্ব আয় করতে পারে। মেলায় আগতদের নিরাপত্তায় পরিচালনা কমিটি গঠনসহ নানা ধরণের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
ভারতীয় সীমান্তর্তী যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের ধারে একটি উঁচুস্থানে পীরে কামেল বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরীফ অবস্থিত। এ রওজা শরীফকে কেন্দ্র করে প্রতি বাংলা সালের ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার মেলা বসে। প্রতিবছর মেলা চলাকালে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে উৎসবের আমেজ সৃষ্টি করে, রেওয়াজ রয়েছে ‘ঈদে-পূজায় না হলেও মেলায় মেয়ে-জামাই আনতেই হবে।’
স্থানীয়দের বিশ্বাস, চৌগাছার যাত্রাপুর গ্রামের ছুটি বিশ্বাসের ছেলে পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। এলাকায় জনশ্রুতি আছে, পীর বলুহ দেওয়ান যা বলতেন তাই হতো।’ তার জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রহস্যে  ঘেরা। তবে জন্মকাল সম্পর্কে আজও কোনো সঠিক তথ্য না মিললে জেষ্ঠ্য ভক্তদের মতে ‘ তিনি প্রায় দুইশ’ থেকে আড়াইশ’ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন।
বলুহ দেওয়ান (রহ) মৃত্যুর পর এ অঞ্চলের তৎকালীন জমিদার কে.টি চৌধুরী তার রওজা এলাকায় সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য ১৫ শতাংশ জমি দান করেন। পীর বলুহ দেওয়ান সম্পর্কে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে, তার বয়স ১০/১২ বছর তখন পিতার আদেশে গ্রামের পার্শ্ববর্তী মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। গরু দিয়ে ক্ষেত নষ্ট করার অভিযোগে ক্ষেত মালিক গরুগুলো ধরতে গেলে তিনি সব গরু বক বানিয়ে বটগাছে বসিয়ে রাখেন।’
তেমনি, পিতার মৃত্যুর পর তিনি উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে মামার বাড়িতে থেকে অন্যের জমিতে দিনমজুরির কাজ করতেন। একদিন সরিষা মাড়াই করতে মাঠে গিয়ে সরিষার গাঁদায় আগুন ধরিয়ে দেন। সংবাদ শুনে গৃহস্থ মাঠে গিয়ে দেখে সরিষার গাঁদায় আগুন জ্বলছে, এতে গৃহস্থ রাগান্বিত হলে তিনি হাঁসতে হাঁসতে ছাই উড়িয়ে দেখিয়ে দেন সরিষা পুড়েনি।
এলাকায় আরও জনশ্রুতি আছে, পীর বলুহ দেওয়ানের মামী তাকে খেঁজুর রসের চুলায় জ্বাল দিতে বললে তিনি জ্বালানির পরিবর্তে চুলায় পা ঢুকিয়ে আগুন জ্বাল দিতে থাকেন। এতে তার পায়ের কোনো ক্ষতি হয়নি। এ ধরণের একাধিক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিতে থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ তার নিকট এসে শিষ্যত্ব নেন। ‘অলৌকিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বলুহ দেওয়ান পীর আখ্যা পান।’ তার মৃত্যুর পর গ্রামাঞ্চলের মানুষ জটিল ও কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেতে তার নামে মানত করতে থাকে এবং প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার হাজরাখানা গ্রামে অবস্থিত তার রওজা শরীফে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, নারকেল ও টাকাসহ নানা দ্রব্যাদি ও টাকা দিয়ে মানত শোধ করতে থাকেন। সেখান থেকেই একসময় এখানে আসা ভক্তদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য গড়ে ওঠে পীর বলুহ দেওয়ান (রহ) মেলা। দীর্ঘদিন থেকে স্বল্প পরিসরে মেলা হতে থাকলেও বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চলছে জমজমাট মেলা।
চৌগাছা থানার অফিসার ইনচার্জ রিফাত খাঁন রাজিব বলেন, মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে।
চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। মেলায় যেন কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিবেশ তৈরি না হয় সে ব্যাপারে কঠোর দৃষ্টি রাখা হচ্ছে।