ঋণ খেলাপ: কার টাকা কে করে মাফ!

43

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীঃ বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর খেলাপি ঋণের উদ্ভব ও বিকাশ হয়। এখন নাকি দেড় লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ। ভারতের খেলাপি ঋণ নাকি ৯৩ লাখ কোটি টাকা। প্রত্যেক দেশে কৃষি ঋণের অঙ্ক ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার ওপরে নয়। মহারাষ্ট্রে গত তিন বছরে নাকি ১৬ হাজার কৃষক ঋণ যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করেছেন। অথচ বাংলাদেশ কিংবা ভারতে একজন ঋণখেলাপিও আত্মহত্যা দূরের কথা, লজ্জিত হয়নি।
গত এক মাস ধরে শুনছি খেলাপি ঋণের হিসাবের কাগজপত্র নাকি মোটা হয়ে গেছে। পুরনো হয়ে ছেঁড়া-ফাটা হয়ে যাচ্ছে, তাই অর্থমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন খেলাপি ঋণ মওকুফ করে দেবেন। কার টাকা কে মওকুফ করে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন এক মওকুফের ফেরে পড়ে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ জমিদার ছিলেন। আবার কবি মানুষ। মানবতাবোধ ছিল। মহাজনি চক্রবৃদ্ধি সুদের হাত থেকে দরিদ্র কৃষকদের রক্ষা করার জন্য তিনি পতিসরে কৃষি ব্যাংক খুলেছিলেন।
পতিসর মুসলিম কৃষকদের বস্তি। সবাই ছিল হতদরিদ্র কৃষক। তিনি ১৯০৫ সালে পতিসরে কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেন এবং এই ব্যাংক ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ভালোই চলেছিল। কৃষকরা মহাজন চক্রবৃদ্ধি সুদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, কিন্তু ১৯২৫ সালে সরকার কৃষকের স্বার্থে রুরাল টেন্যান্সি অ্যাক্ট করে যখন কৃষকদের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দিলো, তখন পতিসরের কালীগ্রামের কৃষি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যায়। কৃষকরা আর টাকা ফেরত দেয়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি দীর্ঘদিন তার জমিদারি চালানোর জন্য লালবাজারের মাড়োয়ারিদের থেকে সুদে টাকা ধার নিতেন। এজন্যই বলেছি, কার টাকা কে মাফ করে দেয়!
আমাদের অর্থমন্ত্রী লোটাস কামাল বলে থাকেন, তিনি জায়গির থেকে লেখাপড়া করেছেন। মানুষের সহানুভ‚তি কুড়ানোর জন্য এসব কথা বড়ই অর্থবহ, কিন্তু এসব কাহিনি তার জীবনের পুরনো ইতিহাস। নবধারা ইতিহাসে তিনি সংসদের ১০ জন উচ্চবিত্তের একজন। তিনি নাকি ১৯৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির অন্যতম অংশীদার। আমি শেয়ারবাজারের ব্যবসায়ী নই, তবে কথাটা শেয়ারবাজারে লোকের মুখে মুখে। যাহোক, আমি বড় অস্তিত্বসম্পন্ন লোকের বিরুদ্ধে মুখ খুলে বিপদে পড়তে চাই না। ঈদের সময় আড়ংয়ের জরিমানা করায় এক সরকারি কর্মকর্তাকে খুলনায় ১২ ঘণ্টার মাঝে বদলি হতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি তার দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগ তার ৭০তম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে গত ২৩ জুন। এদেশের মানুষ গত ৭০ বছরব্যাপী জেনেছে আওয়ামী লীগ এই দেশের গরিব মধ্যবিত্তের সংগঠন। আওয়ামী লীগের এই গৌরবোজ্জ্বল ভ‚মিকা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। কিন্তু আমরা এখন দেখছি আওয়ামী লীগে কায়েমি স্বার্থের ধারক-বাহকের পদচারণা। জনসাধারণ যদি একবার বুঝে আওয়ামী লীগ তার চরিত্র হারিয়েছে, তখন আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্নতার মুখে পড়বে। এখন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস যে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে, সেরকম সংকটে পড়তে হবে। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এ বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য অনুরোধ করবো।
পারস্য কবি শেখ সাদীর একটা কবিতার কথা মনে পড়ে। কবিতাটি নিম্নরূপ:
‘কে আয চঙ্গলে গর্গম দর রবুদী
চু দিদম আকেবত গর্গম তু বুদী।’
মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ তার ‘পারস্য প্রতিভা’ বইতে এই কবিতার বাংলা অনুবাদ করেছেনÑ‘বৃক থেকে উদ্ধারিয়া বৃক পুণ সাজিলা আপনি’। মানে নেকড়ে বাঘ থেকে উদ্ধার করে নিজেই পুনরায় নেকড়ে বাঘ সাজলে তুমি। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশের গরিব আর মধ্যবিত্তরা অনুরূপ কোনও অভিযোগ যেন তুলতে না পারে।
তিন শ’ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এজন্য সাধুবাদ। পূর্বে আবুল মাল আবদুল মুহিত ১২০ জন ঋণখেলাপির তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। তারপরও অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং অবনতি হয়েছে। যে কারণে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে, টাকার অঙ্ক স্ফীত হয়েছে। আমরা খেলাপির বিষয়টা নিয়ে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো ড. আকবর আলি খান, মীর্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, রেহমান সোবহান, আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে আলোচনা করে একটা সুস্পষ্ট সমাধান বের করার যেন চেষ্টা করেন। খেলাপি ঋণের ইস্যুটা জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। দেশে অর্থব্যবস্থা যদি ভেঙে পড়ে, তবে জাতির অপূরণীয় ক্ষতি হবে। সেজন্যই সচেতন সব মানুষই বিষয়টা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
একবার অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত বলেছিলেন সুষ্ঠু অডিট হলে অনেক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাবে। এসব কথা শুনলে তো মানুষ উদ্বিগ্ন হবে। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, ব্যাংক চলার মতো টাকা আছে, লুট করার টাকা নেই। প্রত্যেক বছর বাজেটে সরকারি ব্যাংককে মূলধন সরবরাহ করে বাঁচানো হচ্ছে। এই বাঁচা তো বাঁচা নয়। সরকারেরও কিছু অপরিণামদর্শী কর্মকাÐ জাতীয় জীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য দায়ী। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য কী পরিমাণ আছে, তা সামাল দিতে কয়টা ব্যাংক দরকার, তার কোনও হিসাব-নিকাশ না করে অসংখ্য ব্যাংক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এখন কাস্টমার নিয়ে টানাটানি। ঋণ দিতে কোনও বাধা নেই। এমনিভাবেই তো খেলাপি সৃষ্টি হচ্ছে।
অসংখ্য টিভি চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অসংখ্য পত্রিকার ডিক্লারেশন প্রদান করা হয়েছে। হিসাব করে দেয়নি দেশে যতটুক অ্যাডভারটাইজমেন্ট আছে, তা দিয়ে টিভি-পত্রিকা চলবে কিনা। এখন অনেক পত্রিকা টেলিভিশন চ্যানেল কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না। রাষ্ট্রীয় সহায়তায় এই জটপাকানো উচিত হয়নি।
খেলাপি ঋণের সব খাতই ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি হয়নি। অনেক পরিস্থিতির শিকার হয়ে ঋণখেলাপি হয়েছে। আমার জানা মতে চট্টগ্রাম শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে পুরনো জাহাজের ওঠানামার কারণে মূলধন হারিয়ে খেলাপি হয়েছে। তাদের ব্যাপারটা সহানুভ‚তির সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজ কাটার ব্যবসাটাকে উপলক্ষ করে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। সুতরাং তারা যেন ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে, আবার যারা খেলাপি হয়েছে, তারা যেন সেই ঋণ পরিশোধ করতে পারে তার একটা বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সুদ স্থগিত করে তাদের ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিতে হবে। সুদ মওকুফ করাতে পারলে তাদের পক্ষে প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট পরিশোধ করা আরও সহজ হবে।
এই বিষয়টা অর্থমন্ত্রী ভালো বুঝেন। আমাদের দেশে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক কাজ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বিনষ্ট হয়ে যায়। আশা করি অর্থ মন্ত্রণালয় ঋণখেলাপিদের বিষয়টি দ্রæত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক