আসুন আমরা ইব্রাহিমের বাবা মা’র পাশে দাঁড়াই

ছেলেটির ছবি ভেসে উঠলে মন-মানসিকতা ঠিক থাকেনা। মোচড় দিয়ে উঠে হৃদপিণ্ড। সে যেন আমার রক্তের বন্ধনের কোনো আপনজন। হাটতে, বসতে সবসময় চোখে ভাসে সে। ঘুমোতে গেলেও ভেসে উঠে।

কল্পনায় ভাসে তার বিনয়াতবত আচরণগুলো। শান্তশিষ্ট, নম্র, ভদ্র আর মেধাবী ছেলেটিকে এক মুহূর্তের জন্যও ভূলতে পারছি না।

বলছিলাম আমাদের গলির (চট্টগ্রাম নগরীর জামালখানের রাবেয়া রহমান লেন) মোহাম্মদ ইব্রাহিমের কথা। যে গত ২২ জুলাই বৃহস্পতিবার সকালে ফটিকছড়ির ভূজপুর রাবারড্যামে বেড়াতে গিয়ে পা পিছলে পানিতে পড়ে প্রাণ হারায়। তার মৃত্যুর পর থেকে এলাকার ঘরে ঘরে চলছে শোক। শিশু থেকে বয়স্ক, নারী-পুরুষ কেউ ভূলতে পারছে না কেউ।

ছেলেটি কত ভাল ছিল তা বুঝা গেছে তার নামাজে জানাজায়। রাত সাড়ে এগারোটায় অনুষ্ঠিত জানাজায় উপস্থিত হয় শ’ শ’ মানুষ। তার মুখটি শেষবারের মতো দেখার জন্য সেই মধ্যরাতে ভিড় জমে এলাকার নারী-পুরুষের। শুধু কী তাই। বাইশ মহল্লা কবরস্থানে দাফনের সময় ছুটে যান তার আচরণে মুগ্ধরা। রাতে দেড়টা নাগাদ দাফন শেষ সবাই ফিরেছেন অশ্রুসিক্ত হয়ে।

বাইশ তেইশ বছরের তরুণটির আচরণ ছিল একেবারে ভিন্ন। সচরাচর তরুণদের কোনো স্বভাব তার মধ্যে ছিল না। পড়ালেখা, টিউশনি আর বাবার ছোট্ট দোকানে বাবাকে সহায়তা ছিল নিত্য রুটিন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় স্পটে বেড়ানো হচ্ছে তার শখ। সময় সুযোগ পেলে ছুটতো বন্ধুদের সাথে। এই বেড়ানোই হয়ে যায় তার জীবনের কাল। বেড়াতে গিয়েই হারিয়ে যায় চিরতরে।

ইব্রাহিম ছিল ওমরগনি এমইএস কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। রাবেয়া রহমান লেনের ভেতরে একমাত্র ছোট্ট দোকানটি তাদের। বাবা মোহাম্মদ সেলিম ও সে মিলে চালাতো দোকানটি। দোকানের সামনে গতানুগতিক কোন আড্ডা নেই। আড্ডা হলে এলাকার মানুষের বিরক্তির কারণ হতো সেজন্য তারা সিগারেট বিক্রি করত না।

চলমান করোনাকালীন বৈরিতায় কলেজ বন্ধ। ইব্রাহিম কলেজে না গেলেও অন্যদের মতো বাইরে আড্ডা না দিয়ে টিউশনির পর বাকি সময় বাবাকে সহায়তা করত।

সাধারণ কোন দোকানদার নয় তারা বাবা-ছেলে। তাদের আন্তরিক ব্যবহারে মুগ্ধ এলাকাবাসী। এলাকায় কেউ এসে রিকশা কিংবা ট্যাক্সি ভাড়ার জন্য ভাংতি টাকায় বিড়ম্বনায় পড়তে হতো না। পরম মমতায় ইব্রাহিম ও তার বাবা তাৎক্ষণিক সহায়তায় এগিয়ে আসত। এমনকি অনেকের বাড়ির অতিথিদেরও হাসিমুখে সহায়তা করত।

এলাকার শিশুরা ছিল ইব্রাহিমের অন্যরকম ভক্ত। সে শিশুদের প্রচণ্ড পছন্দ করতো। অবসরে তাদের সাথে ফুটবল, ক্রিকেট খেলতো দোকানের সামনের রাস্তায়। শীতকালে ব্যাডমিন্টন।

তার মৃত্যুর খবর আসার সাথে এলাকায় সৃষ্টি হয় অন্যরকম শোকাবহ পরিবেশ। শিশু থেকে সকল শ্রেণির মানুষ অশ্রুসিক্ত হয়েছেন।

ইব্রাহিমদের বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়ায় হলেও তার জন্ম বেড়ে উঠা রাবেয়া রহমান লেনে। তার মা পাশের গলির একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ছোট চাকরি করে। বাবা একসময় ট্যাক্সি চালাত। তার ছোট বোনটি প্রতিবন্ধী। বাবা, মায়ের আশাভরসা ছিল ইব্রাহিমকে ঘিরে। ইব্রাহিমেরও পরিকল্পনা ছিল অনার্স পাস করে চাকরিতে ঢুকে বাবা, মা’র মুখে হাসি ফুটাবে।

‘সবেধন নীলমনি’ হারিয়ে তার অসহায় বাবা, মা এখন পাগলের মতো। মা নির্বাক হয়ে গেছেন। অন্ধকার দেখছেন গরীব, অসহায় বাবাও। ইব্রাহিমের সহায়তায় করে আসা ছোট্ট দোকানটিও তার বাবার পক্ষে আর করা হবে না। কারণ তিনি দোকানের হিসাব রাখতে পারেন না।

এ অবস্থায় বিত্তবানদের উচিত একমাত্র সন্তানহারা ইব্রাহিমের বাবা, মা’র সহায়তায় এগিয়ে আসা। তাহলেই টিকে থাকতে পারবে পরিবারটি। আসুন আমরা সবাই ইব্রাহিমের পরিবারের পাশে দাঁড়াই।

লেখক : মহসিন কাজী
যুগ্ম মহাসচিব
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।
বোর্ড সদস্য, চট্টগ্রাম ওয়াসা।