আতঙ্ক নয় সচেতনতা-ই করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার উপায়

এইচ এম মেহেদী হাসান: করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের শনাক্ত করা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় ও জরুরি কাজ। কারণ, রোগটি তাদের কাছ থেকেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। আর বাংলাদে এখন পর্যন্ত যেসব ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন,তাঁরা হয় সম্প্রতি বিদেশ থেকে এসেছেন, অথবা সম্প্রতি বিদেশফেরত কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শে ছিলেন। তাই, এখনকার সবচেয়ে জরুরি কর্তব্য বিদেশফেরত ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা,তাঁদের দেহে করোনাভাইরাস প্রবেশ করেছে কি না, তা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নেওয়া। শুধু তা-ই নয়,তাঁদের মধ্যে যাঁরা আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছেন এবং হবেন,তাঁরা ফেরার পর যেসব ব্যক্তির সংস্পর্শে গেছেন, তাঁদেরও স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, বা অন্ততপক্ষে তাঁদের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হা (ডব্লিউএইচও) প্রতিটি দেশকে অনুরোধ জানিয়েছেন যে তারা যেন নাগরিকদের সময়মতো সঠিক তথ্য দেয়। সংস্থার মুখপাত্র তারিক ইয়াসারাভিচ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ইউএননিউজকে বলেন,’আমরা জানি নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও নির্দেশনা পুরোপুরিভাবে অনুসরণ ছাড়া উপযুক্ত ব্যবস্হা কার্যকর করা সম্ভব নয়। স্বাস্হ্য কতৃপক্ষের বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়ার ধারণাটি কেবল তখনই কাজ করে, যখন কী করা উচিত আর কী উচিত নয় এবং তা কেন প্রয়োজন – এগুলো ব্যাখ্যা করা হয়। এটি আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ‘ সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করায় সরকার সফল হলেও সংক্রমণ মোকাবেলায় সরকারের কৌশল পুরোপুরি তুলে ধরা এবং তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা করার বিষয়টি তেমন একটা গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে হয় না। এত ঘন জনবসতির দেশে সেলফ কোয়ারেন্টিন ব্যবস্হা কতটা কার্যকর করা সম্ভব, সেটা আমাদের কারোরই না বোঝার কথা নয়। সংবাদপত্রের ভাষ্য থেকে বোঝা যায় হাসপাতাল থেকে রোগী পালানোর কারণ হচ্ছে সেখানকার চিকিৎসক -নার্স কারোরই ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং হাসপাতালের অন্যান্য রোগীদের সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল না। ফলে তাঁরা রোগীকে ফেলে রেখে কৌশল ঠিক করতে গিয়েছিলেন। সুতরাং সবাইকে মানবিক হয়ে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশেরও বা কতটুকু সামর্থ্য আছে সেটাও বিবেচনা করে কাজ করা উচিৎ। বড় বড় ধনী রাষ্ট্র যেখানে জবুথবু সেখানে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত অনেক এগিয়ে কাজ করছে। এখন শুধুমাত্র সবার সমন্বিত উদ্যোগে এগিয়ে যেতে হবে আর সাধারণ জনগণ সরকারের নির্দেশনা মোতাবেক যদি জীবনযাপন করে তবে অবশ্যই করোনাভাইরাস থেকে বাঁচবে বাংলাদেশ। বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে আমাদের সামনে যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, তা মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টাই আমাদের সবার এই মুহূর্তের প্রধান কর্তব্য। বাংলাদেশে এখনো এই ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি, তা যাতে না ঘটে সেই চেষ্টা সরকারি, বেসরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত সব পর্যায়েই করতে হবে। ভাইরাস প্রতিরোধের পাশাপাশি এই সংকটের অনুষঙ্গ হিসেবে আরও যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে,সেগুলোর কথাও আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। একটি সমস্যা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে : দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। লোকজন চাল-ডালসহ নানা রকমের ভোগ্যপণ্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে কেনা ও মজুত করা শুরু করেছে। কিন্তু এর কোনো প্রয়োজন নেই ;বরং এর ফলে আমাদের সবার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কিনে বাসায় মজুত করার প্রয়োজন নেই এই কারণে যে আমাদের দেশে এসবের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকারও বারবার বলছে পর্যাপ্ত ভোগ্যপণ্য মজুত রয়েছে এবং কি কোনো সংকট হবারও সম্ভাবনা নেই। শুধু অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য ক্রয় করে ক্রিতিম সংকট সৃষ্টি করার কোনো মানে হয় না। বিশেষ করে বাজারে দেখা যায় শিশু খাদ্যের সংকট, এসবই আমাদের কারণে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিচ্ছে। সুতরাং নিজে সচেতন থাকি অপরকে সচেতন থাকতে সহযোগিতা করি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়াসুস প্রেস ব্রিফিং করে বলেছেন, উই আর বায়িং টাইম। একটা মাসও যদি সংক্রমণ পিছিয়ে দেওয়া যায়, তা আমাদের সুযোগ দেবে সক্ষমতা তৈরির। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত হবে। ভ্যাকসিন আসার সময়টাও কাছে চলে আসবে। সংক্রমণের দাবানল এক মাস পিছিয়ে দিতে পারলেও তা বহু জীবন বাঁচবে। সুতরাং এ কথার মর্মবাণী হচ্ছে নিজে নিজে সবাই সেইফ জোনে থাকার নামই হচ্ছে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার উপায়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্হার আহবান বারবার করে সাবান -পানি দিয়ে হাত ধোয়া, কমপক্ষে বিশ সেকেন্ড ধরে হাত ধুতে হবে। নাক,চোখ, মুখে হাত না দেওয়া। পারতপক্ষে ঘরের বাইরে না যাওয়া। ভিড় এড়িয়ে চলা। অন্য মানুষের থেকে কমপক্ষে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রাখা। হাঁচি-কাশির সময় নিজের কনুইয়ের ভাঁজ দিয়ে নাক-মুখ ঢেকে ফেলা। যেখানে সেখানে থুথু না ফেলা। মাছ,মাংস, দুধ,ডিম কাঁচা না খাওয়া। কাঁচা ফল,সবজি খুব ভাল করে ধুয়ে নেওয়া। আপাতত বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ রাখা। বিদেশ থেকে এলে নিজের ঘরে চৌদ্দদিন একলা থাকা। অন্য কাউকে তিন ফুটের মধ্যে আসতে না দেওয়া। অথচ আমরা দল বেঁধে ছুটে গিয়েছিলাম সমুদ্রসৈকতে। সরকার সেগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। এমন কি ধর্মীয় এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করে করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার দু’আ করা হয়েছে! হাটবাজারগুলো আগের মতোই দিব্বি চলছে। সচেতন ব্যতিরেক কোনো জাদু সরকার কিংবা ডাক্তারের হাতে নেই। আমাদের সক্ষমতা বুঝতে হবে। এটা একটা নতুন মহামারী, বৈশ্বিক সংকট। আমাদের হাসপাতালগুলোতে এত সুযোগ-সুবিধা নেই। আমরা প্রস্তুতও নই। ডাক্তার, নার্স, ব্রাদার, কর্মচারীরা কি জানেন, তাঁরা করোনাভাইরাস মোকাবিলায় আসলে কী করবেন? কোনো নির্দেশনা আছে,কোনো প্রশিক্ষণ আছে?নিজেদের তাঁরা যে রক্ষা করবেন,সেই যন্ত্রপাতি, রসদ আছে? আইসিইউ, ভেন্টিলেটর তো অনেক পরের প্রশ্ন। কাজেই শুধুই সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না নিজেকে বাঁচাতে নিজেই সচেতন হতে হবে, নিজেকে নিজেই বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে। নিজে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেষ্টার নামই করোনাভাইরাস প্রতিরোধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্হার মহাপরিচালক বলেছেন,কোনো দেশ যদি ভাবে আমাদের দেশে করোনা আসবে না,তা হবে ভুল।

কেউ যদি ভেবে থাকেন, আমাকে করোনাভাইরাস ধরবে না, ভুল হবে। আমাকেও ধরবেও এই ভেবে প্রস্তুতি নিতে হবে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লুতে সারা পৃথিবীর পঞ্চাশ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যু বরণ করেছিলো। শুধু আমেরিকাতেই ছয় লক্ষ সত্তর হাজার মানুষের প্রাণ গিয়েছিল। সুতরাং করোনাভাইরাস কে হেলাফেলা করার সময় এখন নেই। বিশ্ববাসী আজ উদ্বিগ্ন, বাংলাদেশ তার বাহিরে নয়। আমাদের ধন সম্পদ কম থাকে পারে কিন্তু আমাদের সাহস শক্তি মত্তা এবং প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতাই আমাদের একমাত্র উপায়। করোনাভাইরাসকে যদি আমরা মহামারী আকারে আমাদের দেশে দেখতে না চাই তবে অবশ্যই প্রতিটি জেলাকে লক ডাউন করে, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে সারা দেশে কার্যপরিচালনা করা। বিশেষ করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য রেসনের ব্যবস্হা করা, আর শহরের মানুষের জন্য অর্থাৎ যাঁরা ভাড়া থাকেন তাঁদের ভাড়া মওকুফ করে সাধারণ জনগণকে উৎসাহিত করা ঘরে ভিতর থাকার। সাধারণ মানুষের ভোগ্যপণ্য উন্নত দেশের ন্যায়, আমাদের দেশের পক্ষে বাসায় বাসায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু পারতপক্ষে তাঁদের ঘর বাসা ভাড়া মওকুফ, ব্যাংক সুদ,বীমা সুদ ইত্যাদি মওকুফ করে সাধারণ জনগণকে হোমকোয়ারেইন্টে রাখা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি। অন্যথায় এই মহামারী আরও ব্যাপকতা লাভ করবে বলে ধারণা করা হয়। যেহেতু বাংলাদেশের মানুষের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা পৃথিবীর অন্য দেশের চাইতে বেশি। চীন পরিস্হিতি সামলে নিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সামাল দিতে পারছে। চীনে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নব্বই ভাগ শুরু হয়ে গেছে। চীন চালু হলে তা আমাদের জন্য সুখবর। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুটো খাত জনশক্তি আর তৈরি পোশাক। দুটো খাতেই ধস নামবে,এ আশঙ্কা বাস্তব। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাড়াচ্ছে কাঁচামাল আমদানীতে। চীনের করোনা বাংলাদেশের বহু শিল্পকে স্থবির করে দিচ্ছিল। পশ্চিমা দেশগুলোয় দোকানপাট বন্ধ থাকায় তারা অর্ডার বন্ধ করে দেবে, এতে আমাদের পোশাকশিল্প কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হবে। এই বৈশ্বিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আগাম পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আমাদের যতোটুকু সক্ষমতা আছে তার সবটুকুই আন্তরিকতার সাথে প্রয়োগ করতে হবে। করোনাভাইরাস কোনো ধনী গরিব দেখে আক্রমণ করেনা, বস্তি, ভবঘুরে, ছিন্নমূল মানুষদের জন্যও বিশেষ ব্যবস্হা নিতে হবে, সরকারের সামনে এখন একটিই ইস্যু করোনাভাইরাস এর বাইরে কোনো বিকল্প চিন্তাও যেনো না আসে। একটি বিষয়ে বারবার নজরে আসছে সেটা হলো সরকারি হাসপাতালে করোনাভাইরাসের জন্য পৃথক কেবিনের ব্যবস্হা গ্রহণ করা হয়েছে, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন পর্যন্ত প্রাক-প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্হাও গ্রহণ করেনি। এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। মনে রাখতে হবে করোনাভাইরাস যদি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে তখন কিন্তু হাসপাতাল ছেড়ে পালালেও লাভ হবে না। ব্যবসায়িক মনোভাব বাদ দিয়ে মানবিক বিবেচনায় সমস্ত বেসরকারী হাসপাতালতে নিজে থেকেই করোনাভাইরাসের কেবিনের ব্যবস্হা করা খুবই জরুরি। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের অনেকেই সরকার নির্দেশিত কোয়ারেন্টিন শর্ত সঠিকভাবে মানছেন না। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে এমন তথ্য ছড়াচ্ছেন যা বিভ্রান্তিকর। দেব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্হা গ্রহণের মধ্য দিয়ে সচেতন করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষা শুরু করা হয়েছে। চিকিৎসকরাও নিরাময়ের সফল হওয়ার অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। এই রোগে আক্রান্তদের তিরাশি ভাগকে হাসপাতালে চিকিৎসা না নিয়েই সারানো গেছে, সতের ভাগের মতো গুরুতর অসুস্হ হয়েছেন, মৃত্যুর হার কমবেশি দুই দশমিক তিন ভাগ। আমাদের কর্তব্য বাংলাদেশে এর বিস্তার ঠেকিয়ে রাখা,যথাসম্ভব বিলম্বিত করা। টেড্রোস আধানমের ভাষায়, বায়িং টাইম। যেই চীনে করোনাভাইরাসের জন্ম সেই চীনে এখন আর সংক্রমণের নতুন কোনো খবর নেই। তবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ইউরোপ মহাদেশে। সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে এতো তাড়াতাড়ি থামছেন না করোনাভাইরাসের দাপট।

লেখক; কলামিস্ট, সাবেক সহসভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ।