অনলাইন ব্র্যান্ডিং : যে ৪টি উপায়ে বিশ্বাসযোগ্য অনলাইন ব্র্যান্ড তৈরী করবেন

17

অনলাইন ব্র্যান্ডিং এর যুগ শুরু হওয়ার পর ব্র্যান্ডিং বা প্রচার যেমন অনেক সোজা হয়ে গেছে, তেমনি মোটামুটি সবাই এটা করতে থাকায়, মানুষজনের কাছে দিন দিন বিরক্তিকর হয়ে উঠছে, সেইসাথে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন ব্র্যান্ডিং বা প্রচারের মাধ্যম বলতে ছিল টিভি, পত্রিকা, বিলবোর্ড, রেডিও। এগুলোর সবগুলোই ছিল ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য।

অনলাইন ব্র্যান্ডিং আসার পর চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। অল্প কিছু টাকা খরচ করে, অথবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যে কেউ চাইলে তার ব্যবসা বা অন্য যে কোনওকিছুর ব্র্যান্ডিং করতে পারে। এটা যেমন নতুন উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই ভালো, তেমনি মানহীন পন্য ও সেবার ব্র্যান্ডিং এর ফাঁদে পড়ে ঠকতে ঠকতে ক্রেতা বা গ্রাহকরা অনলাইন ব্র্যান্ডের থেকে মুখ ফিরিয়েও নিচ্ছেন।

আপনি হয়তো সততার সাথেই কাজ করছেন, যা আছে তার অরিক্ত কিছু বলছেন না – তবুও আপনার ওপরও সম্ভাব্য ক্রেতা বা গ্রাহকদের বিশ্বাস না জন্মাতে পারে। অথবা, একই রকম অনেক কোম্পানীর ব্র্যান্ডিং এর ভিড়ে আপনারটা হয়তো কারও চোখেই পড়ে না।

আর একটা ব্যাপার – মানুষ অনলাইনে আসে তথ্য পেতে অথবা কোনও কনটেন্ট ( অনলাইনে লেখা, ভিডিও, ছবি, অডিও – ইত্যাদিকে কনটেন্ট বলে) দেখতে। তারা যদি আপনার পন্য, সেবা – বা অন্যকিছুর গুনগানের সামনে পড়ে, তবে স্বাভাবিক ভাবেই সেগুলো এড়িয়ে যাবে। (চিন্তা করে দেখুন – আপনি নিজেই অনলাইনের কয়টি এ্যাডে ক্লিক করেন, অথবা এড়িয়ে যান না?)। টেলিভিশনের এ্যাড যেমন বিরক্তিকর, অনলাইনেও তেমন।

কিন্তু পজিটিভ দিক হল, শুধুমাত্র বিজ্ঞাপন প্রচার করাই অনলাইন ব্র্যান্ডিং এর একমাত্র পথ নয়। মানুষকে সত্যিকার সাহায্য করা ও সমস্যা সমাধান করার মধ্য দিয়েও অনলাইনে সুন্দর ব্র্যান্ডিং করা যায়।

আজ আপনাকে এমনই কয়েকটি পদ্ধতির কথা বলব, যেগুলো ব্যবহার করে আপনি উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার প্রতিষ্ঠানের অনলাইন ব্র্যান্ডিং অনেক বেশি ভালোভাবে করতে পারবেন। যার ফলে অন্যদের মধ্যে থেকে আপনার ব্র্যান্ডকে সহজে চিনে নেয়া যাবে, এবং ক্রেতা ও গ্রাহকরাও আপনার ব্র্যান্ডের ওপর ভরসা করবে।

০১. ডিজাইনে নতুনত্ব আনুন, এবং অন্যদের চেয়ে আলাদা থাকার চেষ্টা করুন

আগেই বলেছি, ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা যখন একই রকম জিনিস বিভিন্ন জায়গায় দেখে – তখন তারা সবগুলোকে একই রকম ধরে নেয়। ইন্টারনেটে এ্যাড বা ওয়েবসাইটের জন্য প্রচুর থিম পাওয়া যায়। এবং সবগুলোর মাঝেই কিছু না কিছু মিল আছে। এমনকি একই জিনিস একটু এদিক ওদিক করে নতুন থিম বানানো হয়। এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এগুলোই ব্যবহার করে।

আপনার এ্যাড বা ওয়েবসাইট কেমন – সেই বিষয়ে একজন গ্রাহক মাত্র ৩ সেকেন্ডের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। এবং এর মধ্যে যদি ইউনিক কিছু না থাকে, তবে তা এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আপনি যদি কমন টাইপের ডিজাইন ব্যবহার করেন, তবে অবচেতনে একজন গ্রাহক বুঝে ফেলে যে এটার পেছনে খুব বেশি খাটাখাটনি করা হয়নি। গ্রাহককে ধরে রাখার জন্য, এবং তার বিশ্বাস অর্জনের জন্য আপনাকে সৃষ্টিশীলতা দেখাতে হবে।

যে কোনও ডিজাইনের জন্য এমন থিম ভাবুন – যেটা আর কেউ ব্যবহার করে না। প্রয়োজন হলে একজন ভালো ডিজাইনারের পেছনে কিছু বাড়তি টাকা খরচ করুন। দিন শেষে এতে আপনার ব্র্যান্ডেরই লাভ হবে।

০২. পজিটিভ রিভিউ বা টেস্টিমনিয়াল নতুন গ্রাহকদের সামনে আনুন

আপনার ব্র্যান্ড বা প্রোডাক্ট নিয়ে ব্যবহারকারীদের মতামত দিতে উৎসাহিত করুন। পজিটিভ রিভিউ গুলো আপনার ওয়েবসাইট বা সোশ্যাল মিডিয়া পেজের এমন জায়গায় রাখুন – যেখান থেকে নতুন ব্যবহারকারীরা সহজে দেখতে পারে। আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা রিভিউ এর চেয়ে, সত্যিকার ব্যবহারকারীদের দেয়া রিভিউ নতুন ব্যবহারকারীরা বেশি বিশ্বাস করবে। প্রয়োজনে প্রথম দিকে বন্ধু বা পরিচিতদের কাছ থেকে পজিটিভ রিভিউ নিন, এবং সেগুলো আপনার অনলাইন পেজগুলোতে রাখুন। ইদানিং বেশিরভাগ মানুষই অনলাইনে অন্যদের দেয়া রিভিউ দেখে কোনও ব্র্যান্ডের পন্য কেনে বা তাদের ফলো করে। কাজেই এই ব্যাপারটিকে যত ভালোভাবে পারা যায়, কাজে লাগান।

০৩. এমন কনটেন্ট তৈরী করুন, যেগুলো আসলেই মানুষের কাজে লাগে

প্রতিটি ব্র্যান্ডই চায় মানুষের কাছে তাদের প্রোডাক্ট ও সার্ভিস বিক্রী করতে। একটি ওয়েবসাইট, সোশ্যাল প্রোফাইল থাকার প্রধান কারনই সেটা। কিন্তু আপনি যদি শুধু নিজের প্রোডাক্ট ও সার্ভিস বিক্রী করার ওপরই শুধু ফোকাস করেন – তবে আপনার গ্রাহকরা আপনার ওয়েবসাইটের লেখা, ভিডিও, ছবি – ইত্যাদি কনটেন্টের ওপর আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

এর বদলে আপনাকে এমন কনটেন্ট বানাতে হবে, যেগুলো এমনিতেই মানুষের কাজে লাগে। ধরুন, আপনি ঘরে ব্যবহার করা ইলেকট্রনিক সামগ্রী বিক্রী করেন। অনলাইনে অর্ডার পেয়ে আপনি হোম ডেলিভারি করেন।

এখন আপনি যদি শুধুই আপনার প্রোডাক্টের গুনগানই আপনার কনটেন্টের মধ্যে রাখেন – তাহলে মানুষ বোর হয়ে যাবে। এবং আপনার কনটেন্ট সামনে দেখলে ক্লিক করতে আগ্রহী হবে না।

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন অনলাইন মার্কেটার গ্যারি ভেইনারচাক এর মতে, আপনি যদি এমন কনটেন্ট বানান, যেগুলো মানুষকে কাজে লাগার মত তথ্য দেয়, এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে উপকার করে – তবে আপনার অফার করা সার্ভিস বা পন্য প্রয়োজন হলে তারা আপনার থেকে কেনার কথাই আগে ভাববে।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, প্রয়োজনীয় কনটেন্ট কি? – এগুলো এমন কনটেন্ট যেগুলো থেকে বিনামূল্যে গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় তথ্য পান।

যেমন ধরুন, আপনি ঘরের প্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক সামগ্রী বিক্রী করেন। এখন, শুধু নিজের পন্যের বিজ্ঞাপন না দিয়ে আপনি আপনার কনটেন্ট এর বিষয়বস্তু রাখতে পারেন: “কিভাবে ফ্রিজের আয়ু ১০ বছর বাড়ানো যায়?”, “আপনার ফ্যানের গতি কমে গেলে এই ৩টি কাজ করুন”, “ফ্রিজে বেশি শব্দ হলে কি করবেন?”, “কিভাবে একটি ভালো এসি চিনবেন?” – এই ধরনের কনটেন্ট সত্যিকারেই ব্যবহারকারীদের কাজে লাগে। এবং আপনার ওয়েবসাইট বা সোশ্যাল প্রোফাইলকে দ্রুত জনপ্রিয় করে। সেইসাথে গ্রাহকদের বিশ্বস্ততা বাড়ায়।

এগুলো আপনি লিখিত আর্টিকেল আকারে, ভিডিও আকারে, বা ছবি ভিত্তিক ইনফোগ্রাফিক আকারে আপনার ওয়েবসাইট বা পেজে ছাড়তে পারেন। এতে আপনার ব্র্যান্ডের ভ্যালু বাড়বে। বর্তমানে অনলাইন ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রায় সব ভালো ভালো ব্র্যান্ড কাজে লাগাচ্ছে।

আপনি যে ধরনের পন্য বা সেবা নিয়েই কাজ করুন না কেন – সেই সেক্টরের বিভিন্ন সমস্যা খুঁজে বের করে সেগুলোর বিনামূল্যে সমাধান দিন। দেখবেন আপনার ব্র্যান্ড দিনে দিনে মানুষের কাছে অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

০৪. গ্রাহকরা যেন সহজে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারে

আমাজন ডট কম এর ফাউন্ডার এবং বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি জেফ বেজোস একবার বলেছিলেন, “সেরা কাস্টোমার সার্ভিস হল এমন সার্ভিস যেখানে কাস্টোমারের যোগাযোগ করারই দরকার হয় না।” – মানে এতই ভালো প্রোডাক্ট বা সার্ভিস আপনি দেবেন যাতে কাস্টোমারকে কখনওই কাস্টোমার সার্ভিসে যোগাযোগ করতে না হয়।

তবে এই পর্যায়ে যেতে অনেক সময় আর শ্রম লাগে। যে কোনও ব্যবসায় একটা সময় আসে, যখন তার পন্য বা সেবা পারফেক্ট হওয়ার পথে থাকে। আর এই সময়টাতে সব ধরনের গ্রাহকের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ, মতামত আর প্রশ্ন আসে।

যে কোনও সময়েই আপনার গ্রাহকদের কাছ থেকে ইমেইল, মেসেজ, কমেন্ট – যেটাই পান না কেন, যত দ্রুত সম্ভব উত্তর দেয়ার চেষ্টা করুন। এবং উত্তর যেন গ্রাহকের কাজে লাগে তা নিশ্চিত করুন। যেসব ব্র্যান্ড গ্রাহকদের প্রশ্ন ও অভিযোগের জবাব ঠিকমত দিতে পারে না – গ্রাহকরা সেইসব ব্র্যান্ডের ওপর দ্রুতই আস্থা হারিয়ে ফেলে।

গ্রাহকদের অভিযোগ ও প্রশ্নের জবাব দেয়ার আগে আপনাকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে – যেন আপনার সাথে যোগাযোগ করা তাদের জন্য সহজ হয়। আপনার কনট্যাক্ট এ্যাড্রেস, ইমেইল এ্যাড্রেস সহজলভ্য করুন। ফেসবুক পেজে মেসেজ ও কমেন্টের জবাব যত দ্রুত সম্ভব দিন। গ্রাহকরা যদি দেখে যে আপনি সোশ্যাল মিডিয়া ও ইমেইলে নিয়মিত এ্যাকটিভ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন – তবে তারা আপনার ব্র্যান্ডকে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্র্যান্ড বলে মনে করবে।